সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার রুখতে দৃঢ় ও সময়োপযোগী উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। নির্বাচন বানচালের চেষ্টা, গণমাধ্যমের ওপর হামলায় উসকানি এবং হেট স্পিচের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটাকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে সরকার।
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির পাঠানো এই চিঠিতে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে থাকা বাংলাদেশে কিছু গোষ্ঠী ফেসবুকসহ মেটার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সহিংসতা ছড়ানোর চেষ্টা করছে, যা সরাসরি বাস্তব জীবনের সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে।
নির্বাচনকালীন স্থিতিশীলতা রক্ষায় কড়া নজরদারির আহ্বান
চিঠিতে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ–সংক্রান্ত কনটেন্টে বিশেষ নজরদারি জোরদার করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিশেষ করে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ক্ষতির আহ্বান জানানো কনটেন্টের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে মেটাকে বলা হয়েছে।
গণমাধ্যমের ওপর হামলা ও অনলাইন উসকানির প্রসঙ্গ
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে সহিংস বক্তব্য ও গণমাধ্যমবিরোধী আহ্বান জানিয়েছেন। এসব কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার পর প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে।
সরকার ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও সহিংসতা উসকে দেওয়া অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করতে মেটার পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলেও চিঠিতে অভিযোগ করা হয়।
কঠোর কনটেন্ট মডারেশনের আহ্বান
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি মেটার কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ চেয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে—
- বাংলা ভাষাভিত্তিক কনটেন্ট মডারেশন জোরদার
- প্রেক্ষাপট সংবেদনশীল ও দ্রুত সিদ্ধান্ত
- অনুভূতি বিশ্লেষণ (Sentiment Analysis) শক্তিশালী করা
- সহিংসতা ও হেট স্পিচের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা
বিজ্ঞপ্তিতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী হেট স্পিচ ও সহিংসতায় উসকানি দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।
নাগরিকদের জন্য রিপোর্টিং ব্যবস্থা
শনিবার থেকে নাগরিকদের সহিংস ও উসকানিমূলক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট হোয়াটসঅ্যাপ ও ই-মেইলের মাধ্যমে রিপোর্ট করার আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি। যাচাই শেষে এসব কনটেন্ট বিটিআরসির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করা হবে।
উসকানিমূলক অ্যাকাউন্টে ব্যবস্থা
এদিকে সহিংসতায় উসকানির অভিযোগে সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ইলিয়াস হোসেনের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ সরিয়ে দিয়েছে মেটা। প্রায় ২০ লাখের বেশি অনুসারী থাকা এই অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়াকে অনলাইন সহিংসতা প্রতিরোধে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গঠনে ইতিবাচক উদ্যোগ
সরকার বলছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখেই সহিংসতা, সন্ত্রাস ও ভয়ভীতি ছড়ানো কনটেন্ট প্রতিরোধ করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এতে নির্বাচনকালীন পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকবে এবং নাগরিক ও গণমাধ্যমের নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি বড় ও ইতিবাচক পদক্ষেপ।
সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ