রাজধানী ঢাকার সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার নাম যানজট। প্রতিদিন রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হয় নগরবাসীর। এই যানজট নিরসনে এবার এক বড় এবং সাহসী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা মহাখালী বাস টার্মিনালের বাসগুলোর ডিপো অস্থায়ীভাবে পূর্বাচলে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই উচ্চপর্যায়ের সভা শেষে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসকরা সরকারের এই নতুন পরিকল্পনার কথা গণমাধ্যমকে জানান।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, ঢাকাকে যানজটমুক্ত করতে সরকারের এই মহাপরিকল্পনায় কী কী থাকছে।
১. পূর্বাচলে যাচ্ছে মহাখালীর বাস ডিপো
ঢাকা শহরের টার্মিনালকেন্দ্রিক যানজটের একটি বড় কারণ হলো রাস্তার ওপর যত্রতত্র বাস দাঁড়িয়ে থাকা। মহাখালী এলাকায় এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মহাখালী টার্মিনালের বাসগুলোর ডিপোর জন্য অস্থায়ীভাবে পূর্বাচলে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখন থেকে নিয়ম হবে:
- বাসগুলো স্থায়ীভাবে পূর্বাচলের ডিপোতে অবস্থান করবে।
- টার্মিনালে বাসগুলো শুধু যাত্রী উঠানো এবং নামানোর নির্দিষ্ট সময়ে আসবে।
- যাত্রী নেওয়া শেষ হলেই বাস দ্রুত টার্মিনাল এলাকা ছেড়ে চলে যাবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, রাস্তার ওপর যাতে কোনো বাস দাঁড়িয়ে না থাকে, সেজন্যই প্রাথমিকভাবে পূর্বাচলে এই বাস ডিপো স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং সিটি করপোরেশন এই কাজে সব ধরনের সহযোগিতা করবে।
২. সায়েদাবাদ, গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়া নিয়েও নতুন সিদ্ধান্ত
শুধু মহাখালী নয়, ঢাকার অন্য প্রধান টার্মিনালগুলো নিয়েও সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
- সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া: সায়েদাবাদ এবং ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালের যানজট কমাতেও একই রকম অস্থায়ী বিকল্প স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালকে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
- কাঁচপুর টার্মিনাল: কাঁচপুরে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে ঢাকার বাইরে থেকে আসা বাসগুলো শহরের ভেতরে না ঢুকেই সেখান থেকে ফিরে যেতে পারে।
- গুলিস্তান টার্মিনাল: গুলিস্তান এলাকার যানজট দূর করতে সেখান থেকেও বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
৩. বিআরটি (BRT) প্রকল্প নিয়ে বিশেষ আলোচনা
গাজীপুর থেকে ঢাকা পর্যন্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প নিয়ে জনগণের দুর্ভোগের শেষ ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হয়েছে। সভায় এই প্রকল্প নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, এতো টাকা বিনিয়োগ এবং জনগণের এতো দুর্ভোগের পর এখন যদি বিআরটি প্রকল্প পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়, তবে তা একটি নেতিবাচক উদাহরণ তৈরি করবে। তাই এই প্রকল্পটিকে কীভাবে আরও উন্নত করে একটি চমৎকার “পাবলিক ট্রান্সপোর্ট করিডোর” হিসেবে ব্যবহার করা যায় এবং জনগণের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। আগামী সাত দিনের মধ্যে এই বিষয়ে একটি বিকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হবে।
৪. ফুটপাত দখলমুক্ত ও হকারদের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা
ঢাকার যানজটের আরেকটি বড় কারণ হলো ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়া, যার ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে মেইন রাস্তা দিয়ে হাঁটে। এই সমস্যার সমাধানেও সরকার মানবিক কিন্তু কঠোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানান, হকারদের হুট করে উচ্ছেদ না করে আবার রাস্তায় বিশৃঙ্খল অবস্থায়ও না রেখে কীভাবে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওথায় আনা যায়, সেই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি হকারদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে ফুটপাত পুরোপুরি জনসাধারণের চলাচলের উপযোগী থাকে।
৫. শাহবাগে চালু হচ্ছে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল
ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহ থেকেই রাজধানীর ব্যস্ততম শাহবাগ এলাকায় আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যদের যেমন সুবিধা হবে, তেমনি চালক ও পথচারীদের মধ্যেও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে এবং মানুষকে যানজটের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে সরকারের এই স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সত্যিই প্রশংসনীয়। মহাখালী বাস ডিপো পূর্বাচলে নেওয়া এবং কাঁচপুর টার্মিনাল দ্রুত চালু করা সম্ভব হলে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোর যানজট অনেকটাই কমে আসবে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করে নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে পারে।




