আমাদের দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ের রোগীদের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট ছিল নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ (ICU)। যেকোনো জরুরি বা জটিল রোগে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে আইসিইউ-এর প্রয়োজন হলেই ছুটে আসতে হতো রাজধানী ঢাকা কিংবা বড় কোনো বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে। অনেক সময় দূর-দূরান্ত থেকে রোগী নিয়ে আসার পথেই অনেকের প্রাণ চলে যেত।
জেলা পর্যায়ের মানুষের এই দীর্ঘদিনের কষ্ট ও চিকিৎসাসেবার সংকট দূর করতে সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশের ১০টি জেলা সদর হাসপাতালে নবনির্মিত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এই আধুনিক আইসিইউ ইউনিটগুলোর উদ্বোধন করেন।
যেসব জেলা হাসপাতালে নতুন আইসিইউ চালু হলো
জরুরি রেসপন্স ও মহামারি প্রস্তুতি (ইআরপিপি) প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ১০টি জেলা হাসপাতালকে বেছে নেওয়া হয়েছে এই আধুনিক সেবার জন্য। হাসপাতালগুলো হলো:
১. নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতাল (যেখানে মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়)।
২. মুন্সীগঞ্জ: মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল।
৩. টাঙ্গাইল: টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল।
৪. সুনামগঞ্জ: সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতাল।
৫. গোপালগঞ্জ: গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল।
৬. চুয়াডাঙ্গা: চুয়াডাঙ্গা জেলা হাসপাতাল।
৭. যশোর: যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল।
৮. শেরপুর: শেরপুর ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতাল।
৯. মাদারীপুর: মাদারীপুর জেলা হাসপাতাল।
১০. বাগেরহাট: বাগেরহাট জেলা হাসপাতাল।
বিশেষ তথ্য: রোববার (১৪ জুন) সকাল ১০টায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে উপস্থিত থেকে এই কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন। বাকি ৯টি জেলা হাসপাতাল এই মূল অনুষ্ঠানের সাথে অনলাইনে বা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিল।
আইসিইউ ইউনিটে কী কী আধুনিক সুবিধা থাকছে?
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই আইসিইউ ইউনিটগুলো কেবল নামেই আইসিইউ নয়, বরং এগুলোকে অত্যন্ত আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের সরঞ্জাম দিয়ে সাজানো হয়েছে।
- শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা: প্রতিটি আইসিইউ ইউনিটে রয়েছে প্রয়োজনীয় পেডিয়াট্রিক ভেন্টিলেটর (Pediatric Ventilator), যা শিশুদের জরুরি শ্বাসকষ্ট দূর করতে চিকিৎসকদের সাহায্য করবে।
- অক্সিজেন সাপোর্ট: নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেনের জন্য দেওয়া হয়েছে আধুনিক অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরসহ সব প্রয়োজনীয় লাইফ সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট।
- দক্ষ জনবল: শুধু যন্ত্রপাতি দিলেই তো আর চিকিৎসা হয় না, তাই এই জটিল আইসিইউ ইউনিটগুলো সার্বক্ষণিক ও সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য এই উদ্যোগের সুফল কী?
সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেলা পর্যায়ে এই ১০টি আধুনিক আইসিইউ ইউনিট পুরোদমে চালু হওয়ার ফলে দেশের স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরণের পরিবর্তন আসবে। এর মূল সুফলগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- ক্রিটিক্যাল কেয়ার সেবা: এখন থেকে জেলা পর্যায়ের শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক সব ধরণের জটিল রোগীদের জন্য নিজ জেলাতেই উন্নতমানের লাইফ সাপোর্ট ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
- ঢাকার ওপর চাপ কমবে: গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার জন্য পরিবারকে আর ঢাকা বা বড় শহরের ব্যয়বহুল হাসপাতালের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। এতে ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর চাপ অনেকটাই কমে আসবে।
- দ্রুত চিকিৎসা ও খরচ বাঁচবে: স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত চিকিৎসা শুরু হওয়ায় রোগীর জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। একই সাথে রাজধানী শহরে গিয়ে চিকিৎসা করার বিশাল যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক খরচ থেকেও বাঁচবে সাধারণ পরিবারগুলো।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ও মহামারি প্রস্তুতি
উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের (World Bank) আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশে ‘জরুরি রেসপন্স ও মহামারি প্রস্তুতি’ (ERPP) নামে একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্যই হলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো মজবুত করা এবং যেকোনো বড় মহামারি বা জরুরি স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা করার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তারই ধারাবাহিকতায় এই ১০টি জেলা হাসপাতালে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন আইসিইউ স্থাপন করা হয়েছে।
সরকারের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে দেশের বাকি জেলাগুলোতেও খুব দ্রুত এই ধরণের লাইফ সাপোর্ট সুবিধা পৌঁছে যাবে।




