মরক্কোর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন রূপান্তর ঘটল। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ পেয়েছেন ফাতিমা জাহরা এল মানসুরি (Fatima Zahra El Mansouri)। মরক্কোর রাজপ্রাসাদ থেকে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে জানানো হয়, রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ তাঁকেই নতুন সরকার গঠনের নির্দেশ প্রদান করেছেন।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দেশের পার্লামেন্ট নির্বাচনে এল মানসুরির দল ‘লিবারেল-সেন্ট্রিস্ট অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি’ (PAM) এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসন লাভ করার পরেই এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ঘোষণা আসে।
১. নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও পিএএম (PAM)-এর সাফল্য
পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস’-এ মোট আসনের দিক থেকে পিএএম (PAM) শীর্ষে উঠে আসে।
- নির্বাচনী ফলাফল: নির্বাচনে পিএএম পেয়েছে ৯৭টি আসন। অন্যদিকে বিদায়ী সরকারের প্রধান শরিক দল আরএনআই (RNI) ৬৬টি, ইস্তিকলাল ৬৫টি এবং মধ্যপন্থি ইসলামপন্থি পিজেডি (PJD) ৫৪টি আসন লাভ করেছে।
- ভোটার উপস্থিতি: এবারের নির্বাচনে প্রায় ৩৮ শতাংশ ভোটার ভোট প্রদান করেছেন, যা পাঁচ বছর আগের (প্রায় ৫০ শতাংশ) তুলনায় কিছুটা কম।
মরক্কোর সংবিধান অনুযায়ী, রাজতন্ত্র বজায় থাকলেও পার্লামেন্টে বিজয়ী একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধানকেই প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের বিধান রয়েছে।
২. রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও আদর্শিক অবস্থান
২০০৮ সালে রাজার একজন উপদেষ্টার উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল পিএএম। দলটি মূলত সমাজকে আধুনিকায়ন করা এবং ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানের পক্ষে সোচ্চার।
- দীর্ঘ দিন ধরে তারা ইসলামপন্থি জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (পিজেডি) প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করে আসছে।
- নির্বাচনী প্রচারণায় বিদায়ী জোটের শরীকদের প্রতি নানা অসন্তোষ থাকলেও নতুন প্রধানমন্ত্রী এল মানসুরি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—নতুন সরকার গঠনে কোনো ‘লাল দাগ’ থাকবে না এবং অতীতের মতভেদ ভুলে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া হবে।
৩. কে এই ফাতিমা জাহরা এল মানসুরি?
রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সুপরিচিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব হলেন নতুন এই প্রধানমন্ত্রী।
- পেশা ও দায়িত্ব: পেশায় একজন আইনজীবী এল মানসুরি পূর্বে দেশটির বিদায়ী সরকারের আবাসনমন্ত্রী হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
- মারাকেশের মেয়র: তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত মরক্কোর ঐতিহাসিক মারাকেশ শহরের মেয়রের দায়িত্বও দক্ষতার সাথে সামলেছেন।
- প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা: প্রশাসনিক যোগ্যতা ও দূরদর্শিতার কারণেই তাকে নতুন সরকার প্রধান হিসেবে উপযুক্ত মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
৪. নতুন সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জসমূহ
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এল মানসুরিকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব সফলভাবে সামলাতে হবে:
১. ২০৩০ ফুটবল বিশ্বকাপ প্রস্তুতি: স্পেন ও পর্তুগালের সাথে যৌথভাবে ২০৩০ ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করবে মরক্কো। এ উপলক্ষে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ এগিয়ে নেওয়া তার সরকারের বড় পরীক্ষা।
২. তরুণদের অসন্তোষ ও বেকারত্ব দূরীকরণ: দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে থাকা বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক ক্ষোভ দূর করা।
৩. জোট সরকার গঠন: বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও শক্তিশালী মন্ত্রিসভা উপহার দেওয়া।
মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের অধীনে দেশে নারীদের ক্ষমতায়নে নানা পরিবর্তন এসেছে। সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পদে নারীদের নিয়োগ দেওয়া হলেও, প্রধানমন্ত্রী পদমর্যাদায় নারী নেত্রীর আগমন দেশটিকে বিশ্ব দরবারে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেছে। ফাতিমা জাহরা এল মানসুরির নেতৃত্বে মরক্কো নতুন এক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে বলেই সবার প্রত্যাশা।




