পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ, আনুগত্য ও তাকওয়ার এক মহান শিক্ষা। এই দিনের অন্যতম প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো কুরবানি। তবে প্রতি বছরই কুরবানির সময় হলে অনেকের মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে কুরবানি কি শুধু ঈদের দিনই করতে হবে, নাকি পরবর্তী দিনগুলোতেও করা যাবে?
ইসলামি শরিয়ত এ বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। সঠিক সময়ে ও শরিয়তসম্মত উপায়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি আদায় করতে হলে এর নির্ধারিত সময় ও নিয়মগুলো সম্পর্কে জানা আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
পবিত্র কুরআনে কুরবানির গুরুত্ব ও হাদিসের নির্দেশনা
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে কুরবানির স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে এর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
‘অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় কর এবং কুরবানি কর।’ (সুরা আল-কাওসার: আয়াত ২)
কুরবানি কখন থেকে শুরু হবে এবং কখন করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে, সে বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন:
‘যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে কুরবানি করল, সে নিজের জন্যই পশু জবাই করল। আর যে নামাজের পরে কুরবানি করল, তার কুরবানি সম্পন্ন হলো এবং সে মুসলমানদের সুন্নাহ অনুসরণ করল।’ (সহিহ বুখারি: ৫৫৪৫, সহিহ মুসলিম: ১৯৬১)
কুরবানির সময় কখন শুরু হয় এবং কতদিন থাকে?
হিজরি বছরের জিলহজ মাসের ১০ তারিখ পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়। এই দিন বিশ্ব মুসলিম ঈদের নামাজ আদায়ের পর আল্লাহর নামে পশু কুরবানি করে থাকে। শরিয়তের দৃষ্টিতে ১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকেই কুরবানির সময় শুরু হয়ে যায়।
তবে কুরবানি শুধু ঈদের প্রথম দিনেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ‘ফাতাওয়ায়ে আলমগীরি’-তে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে ১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে শুরু করে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত কুরবানি করা সম্পূর্ণ বৈধ। তবে মনে রাখতে হবে, ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পর আর কোনোভাবেই কুরবানি করা জায়েজ বা বৈধ নয়।
ঈদের নামাজের আগে কুরবানি করা কি বৈধ?
কুরবানির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ঈদের নামাজ সম্পন্ন হওয়া। বিখ্যাত ফিকহগ্রন্থ ‘কুদুরি’-তে বলা হয়েছে ঈদুল আজহার দিন ঈদের নামাজের আগে কুরবানি করা বৈধ নয়।
তবে এর একটি ব্যতিক্রমী নিয়মও রয়েছে। যে সমস্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলে বা স্থানে ঈদের নামাজ বা জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় না কিংবা জামাত করার কোনো ব্যবস্থা নেই, সে সব স্থানে ১০ জিলহজ ফজরের নামাজের পর থেকেই কুরবানি করা বৈধ হবে। অর্থাৎ সাধারণভাবে শহরের বা যেখানে জামাত হয় সেখানকার মানুষের জন্য ঈদের নামাজের আগে কুরবানি গ্রহণযোগ্য নয়।
সফরে থাকলে কুরবানির বিধান কী?
যদি কোনো ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন (যার ওপর কুরবানি ওয়াজিব), কিন্তু কুরবানির প্রথম দুই দিন অর্থাৎ ১০ ও ১১ জিলহজ তিনি সফরে বা বাড়ির বাইরে থাকেন, তবে তার জন্য একটি বিশেষ নিয়ম রয়েছে।
ফাতাওয়ায়ে আলমগীরি-র নির্দেশনা অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি যদি ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন, তবে তার ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব হবে। তখন তাকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগেই কুরবানির পশু জবাই করতে হবে।
প্রথম দিনে কুরবানি করতে না পারলে করণীয়
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে কুরবানির সময় মোট তিন দিন (১০, ১১ ও ১২ জিলহজ)। এটি মূলত ইসলামের সহজতা ও মহান আল্লাহর এক বিশেষ মানবিক অনুগ্রহ।
কোনো কারণে যেমন পশুর হাটে পছন্দমতো গরু-ছাগল না পাওয়া, কসাই বা লোকবলের অভাব কিংবা অন্য কোনো বিশেষ সমস্যার কারণে যদি কেউ ১০ জিলহজ ঈদের দিন কুরবানি করতে না পারেন, তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। তিনি ১১ জিলহজ সারাদিন-রাত কিংবা ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় কুরবানি করার পূর্ণ সুযোগ পাবেন।
কুরবানি শুধু একটি সামাজিক বা আনুষ্ঠানিক উৎসব নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাকওয়া অর্জনের এক মহান ইবাদত। ঈদের দিন থেকে শুরু করে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানি করার সুযোগ থাকলেও, যত দ্রুত সম্ভব প্রথম দিনেই আন্তরিকতার সঙ্গে এই ইবাদত সম্পন্ন করা উত্তম। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শুদ্ধ নিয়তে এবং সঠিক সময়ে কুরবানি আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।




