Sunday, July 12, 2026

শয়তানের ভয়ংকর ফাঁদ থেকে বাঁচতে আজই নিয়ন্ত্রণ করুন এই ৪টি বিষয়

বহুল পঠিত

মানুষের জীবনে শয়তানের কুমন্ত্রণা বা ওয়াসওয়াসা একটি চিরন্তন বাস্তবতা। শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সে কখনো গোপনে, আবার কখনো আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের সুযোগ নিয়ে মানুষের ইমান, চরিত্র ও আমলকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো শয়তান কীভাবে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে? কোন পথগুলো ব্যবহার করে সে একজন মুমিনকে গুনাহের দিকে ধাবিত করে?

প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যা অত্যন্ত গভীরভাবে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, শয়তান সাধারণত চারটি দরজা দিয়ে মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে। এই চারটি বিষয় হলো

১. লাগামহীন দৃষ্টি

২. অতিরিক্ত কথা বলা

৩. অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ

৪. অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা

যে ব্যক্তি এই চারটি বিষয় নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, সে শয়তানের অনেক বড় বড় ধোঁকা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। আসুন এই বিষয়গুলো বিস্তারিত জেনে নিই।

১. দৃষ্টি সংযত রাখা: অন্তর পবিত্র রাখার প্রথম ধাপ

অন্তর পবিত্র রাখার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো চোখের হেফাজত করা। শয়তান মানুষের অন্তরে প্রবেশের অন্যতম বড় দরজা হলো অবাধ দৃষ্টি। যখন একজন মানুষ হারাম ও অশ্লীল জিনিসের দিকে তাকায়, তখন ধীরে ধীরে তার অন্তর অন্ধকার হয়ে যায় এবং মনের ভেতর গুনাহের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়।

দৃষ্টি সংযত রাখার ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন,

‘মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।’ (সুরা আন-নূর: আয়াত ৩০)

তাই শয়তানের ভয়ংকর ফাঁদ থেকে বাঁচতে আমাদের অবশ্যই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার থেকে শুরু করে বাস্তব জীবন সব ক্ষেত্রে চোখকে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

২. অতিরিক্ত কথা বলা: গুনাহের সহজ রাস্তা

প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা লাগামহীন কথাবার্তা মানুষকে খুব সহজেই গুনাহের দিকে টেনে নেয়। কম কথা বলা একজন মুমিনের সৌন্দর্য এবং আত্মরক্ষার অন্যতম উপায়। আমরা যখন অনেক বেশি কথা বলি, তখন অজান্তেই গিবত, মিথ্যা, কটূক্তি, অহংকার ও পরনিন্দার মতো ভয়াবহ পাপে জড়িয়ে পড়ি।

অনেক সময় আমাদের মুখের একটি অসতর্ক কথাই পরকালে ধ্বংসের কারণ হতে পারে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি: ৬০১৮)

৩. অতিরিক্ত খাবার: অলসতা ও গাফিলতির কারণ

ইসলাম আমাদের সবসময় পরিমিত আহারের শিক্ষা দেয়। কারণ খাদ্যের সংযম মানুষের আত্মাকে শক্তিশালী করে এবং মনের ভেতর খোদাভীতি বা তাকওয়া বৃদ্ধি করে।

এর বিপরীতে অতিরিক্ত খাওয়া মানুষের শরীরকে অলস এবং অন্তরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল বা উদাসীন বানিয়ে দেয়। পেট পুরে খাওয়ার ফলে ইবাদত-বন্দেগিতে মনোযোগ কমে যায় এবং মানুষের ভেতরের খারাপ ইচ্ছাগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন,

‘মানুষ তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করেনি।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৩৮০)

৪. অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা: ঈমান দুর্বল হওয়ার গোপন কারণ

সঙ্গ বা বন্ধু নির্বাচন মানুষের জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। সৎ মানুষের সঙ্গ মানুষের ঈমানকে মজবুত করে, আর অসৎ সঙ্গ ধীরে ধীরে মানুষকে আল্লাহ ও দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

সবসময় মানুষের ভিড়ে থাকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপ্রয়োজনীয় আড্ডা দেওয়া বা খারাপ বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো মানুষের চিন্তাধারাকে নষ্ট করে দেয়। এর ফলে একটা সময় ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। তাই তোমরা কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছ, তা ভেবে দেখো।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৩৩)

শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার উপায়

শয়তান কখনো সরাসরি এসে মানুষকে বড় কোনো গুনাহ করতে বলে না। সে মানুষের এই দৈনন্দিন ছোট ছোট দুর্বলতার সুযোগ নেয় এবং ধীরে ধীরে গুনাহের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাই একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত:

  • যেকোনো অশ্লীল দৃশ্য বা হারাম উপার্জনকে এড়িয়ে চলা।
  • কথা বলার সময় পরনিন্দা বা গিবত এড়িয়ে চলা এবং বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা।
  • খাবারের ক্ষেত্রে পরিমিত হওয়া এবং সুন্নতি তরিকা মেনে চলা।
  • দ্বীনদার ও ভালো মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করা, যা আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দেয়।

যে ব্যক্তি এই চারটি ক্ষেত্রে নিজেকে সংযত রাখতে পারবে, সে নিজের ঈমান ও আমলকে শয়তানের ভয়ংকর ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে পারবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শয়তানের ধোঁকা থেকে হেফাজত করুন এবং তাকওয়ার জীবন দান করুন। আমিন।

আরো পড়ুন

ফজরের নামাজের ফজিলত: দুনিয়া ও আখিরাতের শ্রেষ্ঠ নিয়ামত লাভের উপায়

ফজরের আজান যখন নিস্তব্ধ রাত ভেদ করে ধ্বনিত হয়, তখন একদল মানুষ পরম তৃপ্তির ঘুমের মায়া ত্যাগ করে মহান রবের ডাকে সাড়া দেন। আবার...

কিয়ামতের দিন সবচেয়ে ভারী আমল কোনটি? জানলে আজই আমল শুরু করবেন!

হাশরের সেই কঠিন দিনে, যখন মানুষের ভালো ও মন্দ কাজের হিসাব নেওয়া হবে, তখন প্রতিটি নেক আমল হবে অত্যন্ত মূল্যবান। মানুষ সাধারণত মনে করে,...

যে ঘরে নেমে আসে আল্লাহর রহমত: পরিবারের প্রতি উত্তম আচরণই ইমানের আসল পরীক্ষা

একজন মানুষের আসল বা প্রকৃত চরিত্র কেমন, তা বোঝার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো তার নিজের পরিবারের সাথে তার আচরণ। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা...
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ