বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে রোববারের ফাইনাল ম্যাচটি আর্জেন্টিনার জন্য শুধু একটি সাধারণ ম্যাচ নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক মহাকাব্যিক উপলক্ষ। কোটি কোটি ভক্তের চোখ এখন এই মেগা ফাইনালের দিকে। এই ম্যাচে শিরোপা জিততে পারলে আর্জেন্টিনা শুধু তাদের বিশ্বকাপের মুকুটই ধরে রাখবে না, সেই সাথে ভেঙে যাবে দীর্ঘ ৬৪ বছরের একটি অপেক্ষার রেকর্ডও। যদি লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা এই গৌরব অর্জন করতে পারে, তবে ১৯৬২ সালের পর তারা হবে প্রথম দল যারা টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য কৃতিত্ব গড়বে।
সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করার পর থেকেই ফুটবল বিশ্বে আলোচনা শুরু হয়েছে আর্জেন্টিনার সামনে থাকা সম্ভাব্য সব রেকর্ড নিয়ে। এর মধ্যে ফুটবল বোদ্ধাদের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরপর দুটি বিশ্বকাপ জয়ের এই অভাবনীয় সুযোগ।
ফুটবল ইতিহাসের সেই বিরল কীর্তি ও পূর্বসূরিরা
ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি দল এই টানা শিরোপা জয়ের বিরল কীর্তি গড়তে পেরেছে।
- ইতালির প্রথম জাদু: প্রথমে ইতালি ১৯৩৪ এবং ১৯৩৮ সালে টানা দুইবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
- ব্রাজিলের রাজত্ব: এরপর কিংবদন্তি পেলের ব্রাজিল ১৯৫৮ এবং ১৯৬২ সালে একই সাফল্য নিজেদের করে নেয়।
১৯৬২ সালের পর থেকে দীর্ঘ ৬৪ বছর কেটে গেছে, কিন্তু পৃথিবীর আর কোনো দলই এই অবিশ্বাস্য অর্জনের পুনরাবৃত্তি করতে পারেনি। এবার লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার সামনে এসেছে সেই ইতিহাস নতুন করে লেখার সুবর্ণ সুযোগ।
খুব কাছে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছিল যারা: ইতিহাসের ট্র্যাজেডি
টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের এই মাইলফলকের খুব কাছাকাছি গিয়েও অনেক পরাশক্তি দলকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।
- আর্জেন্টিনার ১৯৯০ সালের ট্র্যাজেডি: ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনা ১৯৯০ সালেও ফাইনালে খেলেছিল। কিন্তু জার্মানির কাছে হেরে সেবার শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন ভেঙে যায় আলবিসেলেস্তেদের।
- ব্রাজিলের ১৯৯৮ সালের স্বপ্নভঙ্গ: একইভাবে ১৯৯৪ সালের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ১৯৯৮ সালের ফাইনালে উঠেও স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।
- ফ্রান্সের ২০২২ সালের ব্যর্থতা: সর্বশেষ ২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সও ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছিল। তবে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে টানা দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায় ফরাসীদের।
বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের নজির
বিশ্বকআপের ইতিহাসে এমন কিছু অন্ধকার নজিরও রয়েছে, যেখানে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দল পরের আসরে গ্রুপ পর্বের বাধাটাই পার হতে পারেনি। ১৯৩৮ সালের চ্যাম্পিয়ন ইতালি ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে এসে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয়। ঠিক একই লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছিল ২০১৪ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির ক্ষেত্রেও; ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। সেই দিক থেকে আর্জেন্টিনা এবার অনেক বেশি শক্তিশালী এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে ফাইনালে পা রেখেছে।
স্কালোনির আর্জেন্টিনার সামনে নতুন অধ্যায়
এখন আর্জেন্টিনার মূল লক্ষ্য হলো ফুটবল ইতিহাসে নিজেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে এক নতুন অধ্যায় যোগ করা। রোববারের ফাইনালে জয় পেলে স্কালোনির দল শুধু আরেকটি চকচকে বিশ্বকাপ ট্রফিই ঘরে তুলবে না, বরং ফুটবল বিশ্বের ছয় দশকের বেশি সময় ধরে অক্ষত থাকা এক অনন্য রেকর্ডও নিজেদের করে নেবে। ফুটবলপ্রেমীরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন দেখার জন্য ম্যারাডোনা-মেসির দেশ কি পারবে ৬৪ বছরের এই বুড়ো রেকর্ড ভেঙে ফুটবলকে নতুন করে রাঙাতে?
জন্য জরুরি কিছু তথ্য
আর্জেন্টিনার এই অবিশ্বাস্য পথচলার পেছনে মূল কারিগর তাদের কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং দলের খেলোয়াড়দের দুর্দান্ত মেলবন্ধন। সেমিফাইনালে ২-১ গোলের লড়াকু জয় দলটির আত্মবিশ্বাসকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে। চাপের মুখে কীভাবে নিজেদের সেরাটা দিতে হয়, তা এই দলটির ভালো করেই জানা আছে।
রোববারের ফাইনাল ম্যাচটি কেবলই একটি ট্রফির লড়াই নয়, এটি হলো ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকার লড়াই। ৬৪ বছরের রেকর্ড ভাঙার দ্বারপ্রান্তে আর্জেন্টিনা দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়। আলবিসেলেস্তেরা কি পারবে ব্রাজিল ও ইতালির সেই ঐতিহাসিক ক্লাবে নিজেদের নাম লেখাতে? উত্তর মিলবে রোববারের মাঠের লড়াইয়ে। ফুটবল দুনিয়ার সকল চোখ এখন সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের অপেক্ষায়।




