আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগ্রহ বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদ সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ বাংলাদেশ নির্বাচন নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
‘An Interview With Tareq Rahman- Likely Bangladesh’s Next Prime Minister’ শীর্ষক প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে পরিচালিত একাধিক জনমত জরিপ, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং তরুণ ভোটারদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজরে তারেক রহমান
নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগে ইতোমধ্যে ব্লুমবার্গ, টাইম ও দ্য ইকোনমিস্ট তারেক রহমানকে শীর্ষ প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
এবার দ্য ডিপ্লোম্যাট তাকে সরাসরি ‘ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে আখ্যায়িত করলো।
জরিপে স্পষ্ট এগিয়ে বিএনপি
দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ডিসেম্বরে পরিচালিত একটি জনমত জরিপে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতি জনসমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ, যেখানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ১৯ শতাংশ।
এছাড়া বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনোভেশন কনসালটিং পরিচালিত আরেকটি জরিপে দেখা যায়—
- ৪৭ শতাংশের বেশি মানুষ তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান
- ২২.৫ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সম্ভাবনা দেখছেন
জেন জেডই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব
প্রতিবেদনটিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘জেন জেড’ তরুণ ভোটারদের ওপর। দ্য ডিপ্লোম্যাটের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে ভোটারদের একটি বড় অংশ তরুণ প্রজন্ম, যারা ভোটের ফল নির্ধারণে চূড়ান্ত ভূমিকা রাখবে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, জেন জেডের উল্লেখযোগ্য অংশ বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে— বিশেষ করে যেসব কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান।
নির্বাচনী সমাবেশের পথে সাক্ষাৎকার
দ্য ডিপ্লোম্যাট জানায়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সিরাজগঞ্জে একটি নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় টাঙ্গাইলে আরেকটি সমাবেশে যাওয়ার পথে বাসে তারেক রহমানের সঙ্গে এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। সেখানে তিনি অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
জেন জেড প্রসঙ্গে তারেক রহমানের বক্তব্য
জেন জেড নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন-
“আমরা জেন জেডের চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছি। কর্মসংস্থান, কারিগরি শিক্ষা, খেলাধুলা, আইটি খাত ও শ্রমবাজার- এসবই তাদের সঙ্গে গভীরভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।”
তিনি বলেন, সভা-সমাবেশে উপস্থিত তরুণদের উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে জেন জেড বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘দ্য প্ল্যান’ নামের একটি উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করছেন, যেখানে তরুণরা তাদের চিন্তা ও উদ্বেগ তুলে ধরছে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে দ্য ডিপ্লোম্যাট স্মরণ করিয়ে দেয়, শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে ভারতমুখী পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা ছিল।
এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন-
“আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। জাতীয় স্বার্থই হবে সব সম্পর্কের মূল ভিত্তি।”
তিনি জানান, বিএনপি অর্থনীতি-কেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি, পারস্পরিক সম্মান ও পারস্পরিক লাভে বিশ্বাস করে।
অর্থনীতি: ১ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য
বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান বলেন-
“এটা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, দেশের ২০ কোটি মানুষের মধ্যে অন্তত ৫ কোটির কর্মসংস্থান প্রয়োজন এবং আইনশৃঙ্খলা ও ব্যবসা পরিবেশ ঠিক না করলে অর্থনীতি এগোবে না।
তিনি জানান, পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়— এই দুই স্তম্ভের পাশাপাশি বিএনপি গুরুত্ব দেবে—
- আইটি ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প
- লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং
- জুতা শিল্প
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই)
- প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও সৃজনশীল অর্থনীতি
দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা ও জলবায়ু সংকট
ঋণখেলাপি ও অর্থপাচার প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, শক্তিশালী আর্থিক শাসনব্যবস্থা থাকলে এসব সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব।
আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে তিনি বলেন, মানুষ যেন রাতে ভয় ছাড়াই বাড়ি ফিরতে পারে— সেটিই বিএনপির লক্ষ্য।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তিনি জানান-
- ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন
- ২৫ কোটি গাছ লাগানো
- গ্লোবাল ক্লাইমেট ফান্ড থেকে অর্থ সংগ্রহ
জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার
নির্বাচনী অঙ্গীকার প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি তাদের ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করবে—
যার মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা।
তিনি বলেন-
“আমরা জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করব। জনগণের আকাঙ্ক্ষাই হবে আমাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।”
সুত্রঃ বাসস





