Thursday, July 9, 2026

মুনকার নাকির ফেরেশতার পরিচয় ও কবরের প্রশ্নোত্তর: একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাখ্যা

বহুল পঠিত

ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, মৃত্যুর পর পরকালীন জীবনের প্রথম ধাপ হলো কবর। কবরে দাফনের পরপরই মৃত ব্যক্তিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত দুজন ফেরেশতা বিশেষ কিছু প্রশ্ন করেন। এই দুই ফেরেশতাই ইতিহাসে ‘মুনকার ও নাকির’ নামে পরিচিত। আজকের নিবন্ধে আমরা মুনকার নাকিরের পরিচয়, কাজ এবং কবরের পরীক্ষা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

১. মুনকার নাকির কারা?

মুনকার ও নাকির হলেন মহান আল্লাহর দুজন বিশেষ ফেরেশতা। তাঁদের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হলো কবরে মৃত ব্যক্তির ঈমান ও আমল পরীক্ষা করা। হাদিস শরিফের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁরা অত্যন্ত গম্ভীর এবং প্রভাববিস্তারী আকৃতির হয়ে থাকেন।

২. মুনকার নাকির অর্থ কি ?

এই ফেরেশতাদ্বয়ের নাম শুনলেই মনে একটা ভীতি জাগে। আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর গভীর অর্থ রয়েছে:

  • মুনকার (Munkar): এর অর্থ হলো ‘অস্বীকৃত’ বা ‘অপরিচিত’। যেহেতু মানুষ এর আগে কখনও এমন আকৃতির কাউকে দেখেনি, তাই তাঁদের এই নামকরণ।
  • নাকির (Nakir): এর অর্থ হলো ‘ভয়ংকর’ বা ‘অচেনা’।

৩. মুনকার নাকির দেখতে কেমন ?

হাদিসে এই দুই ফেরেশতার শারীরিক গঠনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যা একজন সাধারণ মানুষের জন্য বেশ ভীতিকর। রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বর্ণনা অনুযায়ী:

  • তাঁদের শরীরের রং ঘন নীল বা কালো।
  • তাঁদের চোখ জ্বলন্ত আগুনের মতো।
  • তাঁদের কণ্ঠস্বর মেঘের গর্জনের (বজ্রনিনাদ) মতো গম্ভীর।
  • তাঁদের হাতে থাকে বিশাল একটি হাতুড়ি বা গদা, যা দিয়ে অবাধ্যদের আঘাত করা হয়।

৪. মুনকার নাকিরের কাজ কি ?

মুনকার নাকিরের ফেরেস্তাদয়ের কাজ কাজ হচ্ছে মূলত কবরস্থ ব্যক্তির বিশ্বাস ও কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা, যাকে ‘সওয়াল-জওয়াব’ বলা হয়। ঈমানদার ব্যক্তি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবেন, কিন্তু কাফের বা মুনাফিকরা উত্তর দিতে পারবে না। ঈমানদারদের জন্য তারা সুসংবাদ নিয়ে আসেন আর অবিশ্বাসী ও কাফেরদের ক্ষেত্রে তারা কঠোর শাস্তি প্রদান করেন। তাদের আগমনের ফলে ঈমানদারদের জন্য শান্তির বার্তা এবং অবিশ্বাসীদের জন্য শাস্তির সূচনা হয়

৫. মুনকার নাকিরের প্রশ্নের উত্তর

দাফন সম্পন্ন করে যখন আত্মীয়-স্বজন চলে যায়, তখন এই দুই ফেরেশতা এসে মৃত ব্যক্তিকে বসান এবং তিনটি মৌলিক প্রশ্ন করেন।

কবরে মুনকার নাকিরের ৩টি প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্ন নংপ্রশ্ন (বাংলা ও আরবি)উত্তর (ঈমানদারের জন্য)
তোমার রব কে? (মান রাব্বুকা?)আমার রব আল্লাহ।
তোমার দ্বীন কি? (মা দ্বীনুকা?)আমার দ্বীন ইসলাম।
এই ব্যক্তিটি কে? (মা কুনতা তাকুলু ফি হাযার রাজুল?)/ (মান নাবিউক্কা) তোমার নবি কে? তিনি আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ ﷺ

দ্রষ্টব্য: মুমিন ব্যক্তি সহজেই এই উত্তর দিতে পারবেন। কিন্তু কাফের বা মুনাফিকরা বলবে, “হায়! আমি জানি না।”

৬. আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার

প্রসঙ্গে অনেকে ‘নাহি আনিল মুনকার’ বাক্যটি খুঁজে থাকেন। যদিও এটি ফেরেশতাদের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, তবে এটি ইসলামের একটি মূল স্তম্ভ।

  • আমর বিল মারুফ: সৎ কাজের আদেশ দেওয়া।
  • নাহি আনিল মুনকার: অসৎ বা মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা।দুনিয়াতে যারা এই দায়িত্ব পালন করে এবং মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকে, কবরের পরীক্ষায় তাদের জন্য উত্তর দেওয়া সহজ হবে।

৭. মুনকার নাকির সম্পর্কে কুরআনের আয়াত

পবিত্র কুরআনে সরাসরি ‘মুনকার নাকির’ নাম না থাকলেও কবরের আজাব ও পরীক্ষা সম্পর্কে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

“আল্লাহ ঈমানদারদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে সুদৃঢ় বাক্যে প্রতিষ্ঠিত রাখেন।” (সূরা ইবরাহিম: ২৭)

এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা ঈমানদারদের সুদৃঢ় বাক্য বা ‘কালিমায়ে তাইয়্যেবা’ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) এর মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে অবিচল ও সুপ্রতিষ্ঠিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন । দুনিয়াতে ঈমানের ওপর অটল থাকা এবং কবরের সওয়াল-জওয়াব ও হাশরের ময়দানে ঈমানের সাক্ষ্য দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ মুমিনদের সাহায্য করেন ।

কিছু তাফসীরবিদের মতে, এখানে ‘সুদৃঢ় বাক্য’ বলতে কবরের প্রশ্নোত্তরকে বোঝানো হয়েছে।

৮. কবরের আজাব ও মুনকার নাকিরের পরীক্ষা থেকে বাঁচার দোয়া

রাসুলুল্লাহ ﷺ কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাওয়ার জন্য একটি বিশেষ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। আমাদের প্রতিটি নামাজের শেষ বৈঠকে এটি পাঠ করা উচিত:

আরবি দোয়া:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিন আজাবিল কবর।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাই।

উপসংহার

মুনকার ও নাকির ফেরেশতার মুখোমুখি হওয়া প্রতিটি মানুষের জন্য ধ্রুব সত্য। সেই কঠিন মুহূর্তে মেধা বা মুখস্থ বিদ্যা কোনো কাজে আসবে না; কাজে আসবে কেবল দুনিয়ার নেক আমল ও বিশুদ্ধ ঈমান। তাই আসুন, আমরা পরকালীন সেই পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এখন থেকেই সচেষ্ট হই।

আরো পড়ুন

দ দিয়ে মেয়েদের ইসলামিক নাম অর্থসহ 800+ সুন্দর ও আধুনিক নামের তালিকা

একটি শিশুর জন্মের পর বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় এবং পবিত্র দায়িত্বগুলোর একটি হলো তার জন্য একটি সুন্দর, অর্থপূর্ণ এবং ইসলামিক নাম নির্বাচন করা। নাম কেবল...

হ দিয়ে মেয়েদের ইসলামিক নাম অর্থসহ ৭০০+ সুন্দর নামের তালিকা

একটি সন্তানের জন্মের পর পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় দায়িত্বগুলোর একটি হলো তার জন্য একটি সুন্দর, অর্থবহ এবং ইসলামিক নাম চয়ন করা। নাম কেবল একজন মানুষের...

প দিয়ে মেয়েদের ইসলামিক নাম অর্থসহ ৯০০+ সুন্দর, আধুনিক ও নামের তালিকা

নবজাতক কন্যাসন্তানের জন্য একটি সুন্দর ও অর্থবহ নাম নির্বাচন করা প্রতিটি মুসলিম পিতা-মাতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বর্তমান সময়ে বাংলা বর্ণমালার ‘প’ (P) অক্ষর দিয়ে...
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ