ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়; বরং এটি মানবতার, সাম্যতার ও পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার এক অনন্য বিধান। ইসলামের প্রতিটি বিধানের পেছনে রয়েছে মানুষের কল্যাণ, হৃদয়ের পরিশুদ্ধি এবং সমাজে ন্যায় ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার গভীর শিক্ষা। সেই মহান বিধানগুলোর অন্যতম হলো জাকাত।
জাকাত ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। এটি কেবল ধনীদের সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট অংশ গরিবদের মাঝে বণ্টনের নাম নয়; বরং এটি হৃদয়কে কৃপণতা থেকে মুক্ত করার এক পবিত্র মাধ্যম। জাকাত ধনীর সম্পদকে পবিত্র করে, সম্পদে বরকত আনে এবং সমাজের অসহায়, ফকির, মিসকিন ও অভাবগ্রস্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটায়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন,
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا
‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা (জাকাত) গ্রহণ করুন, যা তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে।’ (সুরা আত-তাওবা: আয়াত ১০৩)
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ
‘তাদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার রয়েছে।’ (সুরা আয-যারিয়াত: আয়াত ১৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ
‘সদকা (জাকাত) সম্পদ কমায় না।’ (মুসলিম ২৫৮৮)
জাকাতের মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ধনী-গরিবের বৈষম্য কমে আসে এবং সমাজে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তবে জাকাত সম্পর্কে অনেকের মাঝেই কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। বিশেষ করে কোন কোন সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ নয়, সে বিষয়ে অজ্ঞতা লক্ষ্য করা যায়। অথচ এই মাসআলাগুলো জানা আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
যেসব সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ নয়
ব্যক্তিগত প্রয়োজন এবং ব্যবসা ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত বেশ কিছু সম্পদের ওপর ইসলামে জাকাত দিতে হয় না। নিচে এগুলোর বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:
১. ঘরে ব্যবহৃত আসবাবপত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস
মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের জন্য ঘরে থাকা আসবাবপত্রের ওপর জাকাত ফরজ হয় না। যেমন:
- কাপড়-চোপড় ও পোশাক-আশাক
- থালা-বাসন ও হাঁড়ি-পাতিল
- ফ্রিজ, টিভি, আলমারি ও শোকেস
- পড়ার টেবিল ও বই-পুস্তক
- ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি।
এসব জিনিস কম ব্যবহৃত হোক কিংবা বেশি ব্যবহৃত হোক তাতে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ এগুলো ব্যবসা বা সঞ্চয়ের জন্য নয়; বরং নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য ব্যবহৃত হয়।
ব্যতিক্রম: তবে কেউ যদি এই আসবাবপত্রগুলো বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে জমা রাখে বা ভবিষ্যতে বিক্রি করে লাভ করার নিয়ত (ব্যবসা) করে, তাহলে সেগুলোর বাজারমূল্য হিসাব করে জাকাত আদায় করতে হবে।
২. বসবাস বা ভাড়ার উদ্দেশ্যে নির্মিত বাড়ি ও ফ্ল্যাট
যে বাড়ি, দালান, ফ্ল্যাট বা জমি নিজের বসবাসের জন্য কিংবা অন্যকে ভাড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাখা হয়, তার মূল্যের ওপর জাকাত ফরজ হয় না। একই সাথে,
- চাষাবাদের উদ্দেশ্যে কেনা জমি
- ভবিষ্যতে নিজের বাড়ি নির্মাণের জন্য কিনে রাখা জমি
- ভাড়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা দোকান বা ভবন
এসবের মূল দামের ওপর কোনো জাকাত আসে না। তবে এই জমি বা ফ্ল্যাট থেকে অর্জিত ভাড়া বা সঞ্চিত অর্থ যদি নিসাব পরিমাণ হয় এবং তা এক বছর নিজের কাছে থাকে, তাহলে সেই জমানো অর্থের ওপর জাকাত ফরজ হবে।
মনে রাখবেন: যদি জমি, ফ্ল্যাট বা বাড়ি সরাসরি ব্যবসা ও পুনরায় বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয়, তাহলে প্রতি বছর তার বর্তমান বাজারমূল্যের ওপর জাকাত আদায় করতে হবে।
৩. শিল্প-কারখানার যন্ত্রপাতি ও অফিস সরঞ্জাম
যেসব শিল্প বা কল-কারখানা উৎপাদনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, সেখানে ব্যবহৃত মূল জিনিসের ওপর জাকাত আসে না। যেমন:
- কারখানার বড় বড় মেশিন ও যন্ত্রপাতি
- অফিসের আসবাবপত্র ও কম্পিউটার
- কারখানার কাজে ব্যবহৃত গাড়ি ও যানবাহন
তবে কারখানায় উৎপাদিত পণ্য, গুদামে মজুদ থাকা বিক্রয়যোগ্য মালামাল এবং কাঁচামালের (Raw Materials) ওপর জাকাত আদায় করতে হবে।
৪. পেশাজীবীদের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও টুলস
কৃষক, মিস্ত্রি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের উপার্জনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের ওপর জাকাত ফরজ নয়। যেমন:
- কৃষকের চাষাবাদের ট্র্যাক্টর
- মিস্ত্রির কাজের ড্রিল মেশিন বা হাতুড়ি
- ডাক্তারের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি
- ইঞ্জিনিয়ারের প্রয়োজনীয় ডিভাইস
কারণ এগুলো জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম, কোনো ব্যবসার পণ্য নয়। তবে এসব পেশা থেকে অর্জিত সঞ্চিত অর্থ যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তবে তা অন্যান্য সম্পদের সঙ্গে হিসাব করে জাকাত দিতে হবে।
৫. ভাড়ায় ব্যবহৃত যানবাহন
যেসব যানবাহন ভাড়ায় চালানো হয় বা ব্যবসার মালামাল বহনের কাজে ব্যবহৃত হয়, যেমন:
- রিকশা ও সিএনজি
- বাস, মিনিবাস ও ট্যাক্সি
- ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান
- লঞ্চ, স্টিমার ও উড়োজাহাজ
এসব যানবাহনের নিজস্ব মূল্যের ওপর জাকাত ফরজ নয়। তবে এগুলো চালিয়ে যে আয় বা লাভ হয়, তা যদি বছর শেষে নিসাব পরিমাণ থাকে, তবে জাকাত দিতে হবে। কিন্তু কেউ যদি এই গাড়িগুলো বিক্রির উদ্দেশ্যে শোরুমে বা স্টক করে রাখে, তবে সেগুলোর মূল্যের ওপর জাকাত আসবে।
৬. ব্যবহৃত অলঙ্কার ও মূল্যবান পাথর
হীরা, মণি-মুক্তা বা মূল্যবান পাথর যদি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অলঙ্কার হিসেবে রাখা হয়, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ হয় না। তবে সোনা ও রুপার অলঙ্কারের ক্ষেত্রে নিসাব পূর্ণ হলে জাকাত দিতে হয়।
নিয়ম: হীরা বা মুক্তা যদি সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে, ভবিষ্যতে বিক্রয়ের নিয়তে বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে মজুদ রাখা হয়, তবেই তার মূল্য হিসাব করে জাকাত দিতে হবে। (তথ্যসূত্র: জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১)
৭. জিপিএফ ও প্রভিডেন্ট ফান্ড
সরকারি জিপিএফ (GPF) ফান্ডের অর্থ সম্পূর্ণভাবে নিজের হাতে আসার আগে তার ওপর জাকাত ফরজ হয় না। তবে চাকরিজীবী ব্যক্তি যদি বাধ্যতামূলক অংশের বাইরে স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত অর্থ ফান্ডে জমা রাখেন, তাহলে সেই অতিরিক্ত অর্থের ওপর জাকাত আদায় করতে হবে তা হাতে আসুক বা না আসুক। একইভাবে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও বিনিয়োগকৃত ইন্সুরেন্স ফান্ডের ওপরও নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী জাকাত ফরজ হয়। (তথ্যসূত্র: আহসানুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪)
৮. নাবালেগ ও মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির সম্পদ
ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী, নাবালেগ শিশু বা মানসিক ভারসাম্যহীন (পাগল) ব্যক্তির সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ নয়। আবার কারো কাছে পাওনা টাকা থাকলে, কিন্তু তা ফেরত পাওয়ার কোনো আশা না থাকে (ডুবন্ত টাকা), তবে তার ওপরও জাকাত আসে না। তবে কয়েক বছর পর যদি সেই অর্থ হঠাৎ ফেরত পাওয়া যায়, তাহলে শুধু বিগত এক বছরের বা চলতি বছরের জাকাত হিসাব করে আদায় করতে হবে।
জাকাত কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে নামাজ ও জাকাতকে একসাথে জুড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন,
وَأَقِيمُوا الصَّלَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ
‘তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা কর এবং জাকাত আদায় কর।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১১০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি
১. আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা।
২. নামাজ প্রতিষ্ঠা করা।
৩. জাকাত আদায় করা।
৪. হজ সম্পাদন করা এবংContainer
৫. রমাজানের রোজা পালন করা।
(সহিহ বুখারি: ৮, সহিহ মুসলিম: ১৬)
জাকাত কেবল একটি অর্থনৈতিক নিয়ম নয়; এটি ঈমান, মানবতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধেরও এক মহান শিক্ষা।
জাকাত ইসলামের এমন এক সৌন্দর্যময় বিধান, যা মানুষের হৃদয়কে কৃপণতা থেকে মুক্ত করে এবং সমাজে ভালোবাসা, সাম্য ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করে। তবে কোন সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ, আর কোন সম্পদের ওপর নয় সে বিষয়ে সঠিক জ্ঞান থাকা আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত জরুরি।




