বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য আজ এক রূপকথার দিন, এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ইউরোপের মাটিতে, ইউরোপেরই কোনো দেশের বিপক্ষে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। আর নিজেদের সেই প্রথম ঐতিহাসিক ম্যাচেই দারুণ এক জয় তুলে নিয়ে ইতিহাস গড়লো লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। শক্তিশালী সান মারিনোকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন বার্তা দিল তপু-হামজাদের বাংলাদেশ।
শুক্রবার (৬ জুন) রাতে সান মারিনোর সেরাভালে স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ফিফা আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে জোড়া গোল করেছেন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার তপু বর্মণ। ইতিহাস গড়ার এই বিশেষ দিনে বাংলাদেশের নতুন কোচ থমাস ডুলির অভিষেক ম্যাচটিও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকল।
র্যাংকিংয়ের ব্যবধান ও শুরুর একাদশ
ফিফা র্যাংকিংয়ের দিকে তাকালে সান মারিনোর (২১১) চেয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ (১৮১)। তবে ইউরোপের কন্ডিশনে খেলা হওয়ায় ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য মোটেও সহজ ছিল না।
এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বাংলাদেশের শুরুর একাদশে ছিলেন না শমিত সোম এবং অভিজ্ঞ এক নম্বর গোলরক্ষক আনিসুর রহমান জিকো। তবে নিয়মিত গোলরক্ষক না থাকলেও লাল-সবুজের দল শুরু থেকেই মাঠের ভেতরে নিজেদের চেনা দাপট বজায় রেখেছিল।
প্রথমার্ধের লড়াই: তপুর গোল এবং সান মারিনোর সমতা
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের ফুটবল খেলতে শুরু করে। তবে ম্যাচের প্রথম ১৯ মিনিটেই স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকদের চমকে দিয়ে গোল আদায় করে নেয় বাংলাদেশ।
তরুণ ফুটবলার শেখ মোরছালিনের একটি নিখুঁত ও চমৎকার ক্রস থেকে ডি-বক্সের ভেতরে উড়ন্ত হেডে বল জালে জড়ান অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার তপু বর্মণ। আর এই গোলের মাধ্যমেই তৈরি হলো এক নতুন ইতিহাস। ইউরোপের মাটিতে, ইউরোপের কোনো দলের বিপক্ষে এটিই বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের সর্বপ্রথম গোল।
তবে বাংলাদেশ এই ১-০ গোলের লিড বা সুবিধা খুব বেশি সময় ধরে রাখতে পারেনি। ম্যাচের ৩১ মিনিটে স্বাগতিক সান মারিনোর ফরোয়ার্ড নিকোলাস জিকোপেত্তি বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিতুল মারমাকে পরাস্ত করে বল জালে পাঠান। ফলে ম্যাচে ১-১ গোলে সমতা ফিরে আসে। এরপর ৩৭ মিনিটে গোল করার একটি বড় সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশের সাদ উদ্দিন, কিন্তু তিনি তা কাজে লাগাতে পারেননি। ফলে ১-১ গোলের সমতা নিয়েই বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্থের রোমাঞ্চ ও তপুর অলৌকিক জয়সূচক গোল
১-১ গোলে প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার পর, দ্বিতীয়ার্থে আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ। দলের নতুন কোচ থমাস ডুলি কৌশল পরিবর্তন করে একযোগে তিনটি পরিবর্তন আনেন দলে। বদলি খেলোয়াড়রা মাঠে নামার পর লাল-সবুজের দল বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রাখতে শুরু করে।
ম্যাচ যখন আস্তে আস্তে ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ম্যাচের ৮৬ মিনিটে আবারও বাংলাদেশের ত্রাতা ও ত্রাস হয়ে আবির্ভূত হন তপু বর্মণ। সান মারিনোর রক্ষণভাগকে ফাঁকি দিয়ে তার করা একটি দৃষ্টিনন্দন ও চোখ ধাঁধানো গোলে বাংলাদেশ ২-১ ব্যবধানে লিড নেয়।
ম্যাচের বাকি সময়ে সান মারিনো অনেক চেষ্টা করেও আর গোল শোধ দিতে পারেনি। রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর সাথে সাথেই ইউরোপের মাটিতে নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশের ফুটবলের ঐতিহাসিক ও প্রথম জয়।
সেরাভালে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে থাকা শত শত প্রবাসী বাংলাদেশি দর্শকেরা লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে, উল্লাস করে মেতে ওঠেন এই ইতিহাস গড়া জয়ের আনন্দে। এই জয় দেশের ফুটবলকে আগামী দিনে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস ক্রীড়ামোদীদের।




