প্রতিপক্ষের একের পর এক আক্রমণে পুরোটা সময় পিষ্ট হয়ে থাকলেও, কোনোমতে ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে টেনে নিয়েছিল আর্জেন্টিনা। তবে নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ায়, মাঠের ভেতরে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। এরপর আক্রমণের চাপ আরও বাড়িয়ে, অতিরিক্ত সময়ে ফেররান তরেসের দারুণ এক গোলে আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার উৎসবে মেতে উঠল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
আমেরিকার নিউ জার্সির বিখ্যাত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রোববারের শ্বাসরুদ্ধকর শিরোপা লড়াইয়ে স্পেনের জয় এসেছে ১-০ ব্যবধানে। এই জয়ের মাধ্যমে প্রথমবার ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে শিরোপা জেতার পর, এবার দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরল স্প্যানিশরা।
স্কোরলাইনের আড়ালে স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্য
ম্যাচের ফাইনাল স্কোরলাইন ১-০ হলেও, এটি দিয়ে পুরো ম্যাচের আসল চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। পুরো ১২০ মিনিটের মধ্যে শেষদিকের কিছু সময় বাদে, স্পেনের শক্ত রূদ্ধদ্বারের রক্ষণের আশেপাশে একরকম পৌঁছাতেই পারেনি আর্জেন্টিনা।
সমগ্র টুর্নামেন্টজুড়ে বলা হচ্ছিল লিওনেল মেসিকে নাকি পুরোপুরি আটকে রাখা অসম্ভব তবে স্প্যানিশ কোচ দে লা ফুয়েন্তে সেই অসম্ভব কাজটিই মাঠের ফুটবলে বাস্তবে রূপ দিয়ে দেখালেন। মিডফিল্ডে রদ্রি ও দানি ওলমোরা কোচের পরিকল্পনা এতটাই নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করেছিলেন যে, প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরানোর কোনো সুযোগই পাননি বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি।
পরিসংখ্যানও বলছে স্পেনের সেই দাপট আর আর্জেন্টিনার নাজেহাল অবস্থার কথা:
- বল পজেশন: প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বলের দখল ছিল স্প্যানিশদের পায়ে।
- শটের সংখ্যা: গোলের জন্য মোট ২০টি শট নেয় স্পেন, যার মধ্যে ১২টিই ছিল গোলপোস্টের একদম লক্ষ্যে।
- আর্জেন্টিনার অবস্থা: বিপরীতে আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে স্রেফ ২টি শট নিতে পেরেছিল, যার একটিও তারা স্পেনের গোলপোস্টের লক্ষ্যে রাখতে পারেনি।
বিশ্বরেকর্ড: পুরো আসরে স্পেন দল স্রেফ ১টি গোল হজম করেছে। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে কম গোল খেয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য রেকর্ড এখন স্প্যানিশদের দখলে।
প্রথমার্ধের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ও সুযোগ মিস
ম্যাচের প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আর্জেন্টিনার রক্ষণে দুবার ভীতি ছড়ায় স্পেন। এর মধ্যে দানি ওলমোর বাড়িয়ে দেওয়া পাস থেকে লামিন ইয়ামালের নেওয়া কোনাকুনি শটটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রুখে দেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস।
এর কিছুক্ষণ পর পাল্টা আক্রমণে বিপদে পড়তে পারতো স্পেন। সবাইকে ছাড়িয়ে বল প্রায় পেয়েই যাচ্ছিলেন লিওনেল মেসি, তবে সময়মতো ডি-বক্সের বাইরে এসে বল ক্লিয়ার করেন স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন। বিরতির ঠিক আগে ৩৯তম মিনিটে দারুণ সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি স্পেনের মিকেল ওইয়ারসাবাল, তার দুর্বল শট সহজেই আটকে দেন ‘বাজপাখি’ মার্তিনেস। প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে ওইয়ারসাবালকে ফাউল করে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্তিনেস।
উত্তেজনা, লাল কার্ড এবং ১০ জনের আর্জেন্টিনা
বিরতির পর মাঠে নামতেই দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে বদলি হিসেবে নামা লেয়ান্দ্রো পারেদেস মাঝমাঠে অহেতুক রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা মারেন। উভয় দলের খেলোয়াড়রা তর্কে জড়িয়ে পড়লে রেফারির সামনে দানি ওলমোকে ধাক্কা মেরে হলুদ কার্ড দেখেন পারেদেস।
ম্যাচের ৭০তম মিনিটে রদ্রিগো দে পল ও ক্রিস্তিয়ান রোমেরোকে তুলে জুলিয়ানো সিমেওনে ও ফাকুন্দো মেদিনাকে মাঠে নামান আর্জেন্টাইন কোচ স্কালোনি। তবে নির্ধারিত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে বড় ধাক্কাটি খায় আর্জেন্টিনা:
- মাঝমাঠে পাউ কুবার্সিকে বাজেভাবে ফাউল করেন এন্সো ফের্নান্দেস।
- আগে থেকেই একটি কার্ড থাকায় তাকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন রেফারি।
- ১০ জনের দলে পরিণত হয়ে আরও ব্যাকফুটে চলে যায় আর্জেন্টিনা।
অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা সময়ে বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর একটি নিশ্চিত শট গোলপোস্টের সামান্য ওপর দিয়ে চলে গেলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলায়।
১০৬তম মিনিটের মহাকাব্যিক গোল ও স্পেনের জয় উৎসব
অসংখ্য সুযোগ হারানোর পর, শেষ পর্যন্ত ১০৬তম মিনিটে এসে কাঙ্ক্ষিত জালের দেখা পায় স্পেন। পেদ্রো পররো দূরের পোস্টে নিকো উইলিয়ামসের উদ্দেশ্যে চমৎকার একটি ক্রস বাড়ান। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস তাকে আটকাতে সামনে এগিয়ে গেলে, সুযোগ বুঝে হেডে সুন্দর কাটব্যাক করেন নিকো। সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা বদলি ফরোয়ার্ড ফেররান তরেস জোরালো শটে বল জালে জড়িয়ে দেন (১-০)।
ম্যাচের ১১৫তম মিনিটে সমতায় ফিরতে মরিয়া মেসি অনেক দূর থেকে ডান দিক দিয়ে একটি বাঁকানো ক্রস বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু বলটি ক্রসবারে লেগে ওপরের জালে পড়ে। শেষ মুহূর্তে তিনটি টানা কর্নার পেয়েও আতলেতিকো মাদ্রিদের মিডফিল্ডার জুলিয়ানো সিমেওনে সুযোগ হাতছাড়া করলে আর্জেন্টিনার সমতায় ফেরার সব আশা শেষ হয়ে যায়।
রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই নিউ জার্সি থেকে শুরু করে মাদ্রিদ—সর্বত্র স্প্যানিশ সমর্থকদের উল্লাসে ফেটে পড়ার দৃশ্য দেখা যায়। আর অন্যদিকে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় অশ্রুসজল চোখে মলিন মুখে মাঠ ছাড়েন মেসি-মার্তিনেসরা। ম্যাচ শেষে অযথা মেজাজ হারিয়ে লাল কার্ড দেখেন পারেদেসও। আর এই হৃদয়বিদারক হারের মধ্য দিয়েই হয়তো সমাপ্তি ঘটল লিওনেল মেসির জাদুকরী বিশ্বকাপ যাত্রার।




