বাংলাদেশে আধুনিক আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে তৈরি হতে যাচ্ছে এক নতুন মাইলফলক। খুব শীঘ্রই দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে শাখা ছাড়া সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল ব্যাংক ব্যবস্থা। ব্যাংকের শাখা, উপশাখা কিংবা এটিএম বুথে সরাসরি না গিয়েও গ্রাহকরা ঘরে বসে কেবল স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করেই সমস্ত ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এই নতুন ব্যাংকিং সেবা অনুমোদনের কার্যক্রম প্রায় চূড়ান্ত। দ্বিতীয় দফায় আবেদন করা ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে ইতোমধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে বাছাই করা হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগামী পর্ষদ সভায় অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে।
ডিজিটাল ব্যাংক কী এবং কীভাবে কাজ করবে?
প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মতো এসব ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো বাস্তব শাখা, উপশাখা কিংবা নিজস্ব কোনো এটিএম বুথ থাকবে না। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়িত হবে অ্যাপ ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে।
- মোবাইল অ্যাপে হিসাব খোলা: গ্রাহকরা ঘরে বসেই জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন।
- লেনদেন ও ঋণের আবেদন: টাকা জমা করা, এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো এবং জামানতমুক্ত বা সহজ শর্তে ঋণের আবেদনও করা যাবে অ্যাপের মাধ্যমেই।
- প্রযুক্তিনির্ভর সেবা: অ্যাপের পাশাপাশি ভার্চুয়াল ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড এবং কিউআর (QR) কোড স্ক্যান করে কেনাকাটা করার উন্নত সুবিধাও এতে থাকবে।
ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ও সুবিধা
দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষকে আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনাই হলো এই ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।
- প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধা: গ্রামাঞ্চলের মানুষ, যারা ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে রয়েছেন, তারা সহজেই সেবা পাবেন।
- ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন: দেশের তরুণ উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা খুব কম খরচে ও দ্রুত সময়ে ঋণ বা মূলধন সুবিধা পাবেন।
- কম খরচ ও দ্রুত সেবা: প্রথাগত ব্যাংকের মতো বিশাল অফিস খরচ না থাকায় গ্রাহকদের বেশ কম খরচে দ্রুততম সময়ে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
বাজারে আসছে যেসব ডিজিটাল ব্যাংক
দেশের এই নতুন সম্ভাবনাময় ব্যাংকিং খাতে কেবল প্রচলিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীই নয়, বিনিয়োগ করতে এগিয়ে এসেছে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS), টেলিকম খাত, ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থা এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
আবেদনকারী বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
- রবি আজিয়াটার ‘বুস্ট’
- বাংলালিংক ও স্কয়ারের যৌথ উদ্যোগ ‘নোভা ডিজিটাল ব্যাংক’
- আকিজ রিসোর্সের ‘মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক’
- আশার ‘মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক’
- ভুটানের ডিকে ব্যাংকের ‘ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান’
- বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, ব্রিটিশ-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক ও জাপান বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক।
(উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে মূলধন, উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সাইবার নিরাপত্তা যাচাই করে ৮টি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে বাছাই করেছে)।
ব্যাংকিং খাতে প্রভাব ও নানা চ্যালেঞ্জ
অভিজ্ঞ ব্যাংকার মো. আরফান আলীর মতে, এই ডিজিটাল ব্যাংক ব্যবস্থা প্রচলিত ব্যাংকগুলোকে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে বাধ্য করবে এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পুরো খাতের দক্ষতা বাড়িয়ে দেবে। বিশেষ করে দেশের তরুণ সমাজ দ্রুত এই ব্যাংকিং সুবিধার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
তবে নতুন এই ব্যবস্থার সামনে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে:
- সাইবার নিরাপত্তা: হ্যাকিং ও ডিজিটাল জালিয়াতি এড়াতে বিশাল আকারের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
- তহবিল বা আমানত সংগ্রহ: শুরুতে তরুণ গ্রাহকদের বড় আমানত বা ডিপোজিট না থাকায় ব্যাংকগুলোর জন্য ফান্ড সংগ্রহ কিছুটা কঠিন হতে পারে।
- ডিজিটাল স্বাক্ষরতা: দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও বয়স্ক গ্রাহকদের মধ্যে পর্যাপ্ত প্রযুক্তি সচেতনতার অভাব এবং অপূর্ণ ডিজিটাল পরিকাঠামো একটা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কবে মিলছে চূড়ান্ত লাইসেন্স?
২০২৩ সালে প্রথম এই ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নানা জটিলতা, নিয়মাবলী সংশোধন ও যাচাই-বাছাই শেষে অবশেষে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়া ৮টি প্রতিষ্ঠানের নথি আগামী পর্ষদ সভায় তোলা হবে এবং সেখান থেকেই চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে শাখাহীন ডিজিটাল ব্যাংক হতে যাচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে যদি এই ব্যাংকগুলো সাইবার নিরাপত্তা রক্ষা করে সেবা দিতে পারে, তবে দেশে অর্থনৈতিক লেনদেনের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যাবে।




