বর্তমান সময়ে আমাদের দৈনন্দিন যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে হোয়াটসঅ্যাপ। ব্যক্তিগত চ্যাট, প্রয়োজনীয় ফাইল লেনদেন থেকে শুরু করে অফিসের কাজ—সবকিছুতেই এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রতিনিয়ত সাইবার অপরাধীদের দাপট বাড়তে থাকায় অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার ঝুঁকিও অনেক বেড়ে গেছে। ব্যবহারকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হোয়াটসঅ্যাপ এবার নিয়ে এলো বেশ কিছু শক্তিশালী নতুন সিকিউরিটি ফিচার। এই ফিচারগুলো ঠিকমতো ব্যবহার করলে সাইবার অপরাধীদের পক্ষে আপনার অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সহজ ভাষায় এই নতুন নিরাপত্তা ফিচারগুলো কী এবং কীভাবে আপনার অ্যান্ড্রয়েড বা আইফোনে এগুলো চালু করবেন, তার বিস্তারিত নির্দেশিকা নিচে তুলে ধরা হলো।
১. দীর্ঘ ও শক্তিশালী টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন পাসওয়ার্ড
আগে হোয়াটসঅ্যাপে টু-স্টেপ ভেরিফিকেশনের জন্য শুধু ৬ সংখ্যার একটি পিন (PIN) ব্যবহার করতে হতো। অনেক সময় ব্যবহারকারীরা নিজের জন্মতারিখ বা ‘১২৩৪৫৬’-এর মতো অতি সহজ পিন ব্যবহার করতেন, যা হ্যাকাররা সহজেই অনুমান করতে পারতো।
নতুন আপডেটে হোয়াটসঅ্যাপ প্রচলিত পিনের বদলে দীর্ঘ ও কাস্টম পাসওয়ার্ড ব্যবহারের সুবিধা দিচ্ছে।
- পাসওয়ার্ডের ধরণ: এই নতুন পাসওয়ার্ডে আপনারা বর্ণ বা অক্ষর (Letters), সংখ্যা (Numbers) এবং বিশেষ চিহ্ন (Special Characters যেমন
@, #, $) একসঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারবেন। - কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ: পাসওয়ার্ডটি দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় কোনো হ্যাকার সহজে এটি ক্র্যাক বা অনুমান করতে পারবে না।
২. একই অ্যাকাউন্টে একাধিক পাসকি (Passkey) ব্যবহারের সুবিধা
হোয়াটসঅ্যাপ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আপডেটগুলোর একটি হলো ‘পাসকি’। এতদিন ভেরিফিকেশন কোড বা এসএমএস পিনের ওপর নির্ভর করতে হতো, যা অনেক সময় সাইবার অপরাধীরা ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি করে নিত। পাসকি ফিচারটি এই ঝামেলা পুরোপুরি দূর করে দেয়।
পাসকি কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?
পাসকি হলো একটি ডিজিটাল চাবি। এর মাধ্যমে আপনাকে আর কোনো পিন মনে রাখতে হবে না। আপনি আপনার ফোনের নিজের সিকিউরিটি সিস্টেম ব্যবহার করেই হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকতে পারবেন। যেমন:
- আঙুলের ছাপ (Fingerprint)
- ফেস আইডি (Face ID)
- ডিভাইসের স্ক্রিন-লক কোড বা প্যাটার্ন
এখন হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের একটিমাত্র অ্যাকাউন্টে একাধিক পাসকি যুক্ত করার সুবিধা দিচ্ছে। ফলে আপনার কাছে যদি একাধিক বিশ্বস্ত ডিভাইস থাকে, তবে সবগুলোতে নিরাপদে লগইন করতে পারবেন।
কীভাবে পাসকি অপশনটি পরীক্ষা ও চালু করবেন?
১. প্রথমে আপনার ফোনের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাপটি ওপেন করুন।
২. উপরের ডান কোণায় থাকা থ্রি-ডট মেনু থেকে Settings (সেটিংস)-এ যান।
৩. এখান থেকে Account (অ্যাকাউন্ট) অপশনে ট্যাপ করুন।
৪. তালিকায় থাকা Passkeys (পাসকি) অপশনটি নির্বাচন করুন এবং স্ক্রিনে আসা নির্দেশাবলী মেনে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ফেস আইডি সেটআপ করে নিন।
৩. অপরিচিত কলারের তথ্য চেনার নতুন ফিচার (অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের জন্য)
অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ একটি বিশেষ ফিচার নিয়ে আসছে, যা অপরিচিত নম্বর থেকে আসা স্ক্যাম বা প্রতারণামূলক কল শনাক্ত করতে সাহায্য করবে।
অনেক সময় দেখা যায় অচেনা কোনো আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে হঠাৎ কল আসে, যা ধরে অনেকে প্রতারণার শিকার হন। নতুন সিকিউরিটি আপডেটের মাধ্যমে অপরিচিত নম্বর থেকে কল এলে স্ক্রিনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেখাবে:
- দেশের তথ্য: কলটি কোন দেশ থেকে আসছে তা আগেই দেখতে পাবেন।
- যৌথ গ্রুপের তথ্য: কলার এবং আপনি একই কোনো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সদস্য কি না, তা আপনাকে জানিয়ে দেওয়া হবে।
এই তথ্যগুলো দেখে আপনি সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন যে অজানা নম্বর থেকে আসা কলটি রিসিভ করা নিরাপদ হবে নাকি এটি কোনো স্প্যাম বা প্রতারণামূলক কল।
৪. নতুন ফিচার থাকা সত্ত্বেও অ্যাকাউন্ট দখলের ঝুঁকি ও প্রতিরোধ
নতুন প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, প্রতারকদের কৌশলও তত বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। হোয়াটসঅ্যাপে দীর্ঘ পাসওয়ার্ড বা পাসকি চালু করার পরেও আপনার অ্যাকাউন্ট দখলের কিছুটা ঝুঁকি থেকেই যায়।
হ্যাকাররা প্রধানত ‘লিন্কড ডিভাইস’ (Linked Devices) সুবিধার অপব্যবহার করে থাকে। প্রতারকরা বিভিন্ন লোভনীয় মেসেজ বা ভুয়া সতর্কবার্তা পাঠিয়ে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করে এবং ক্ষতিকর ব্রাউজার বা অন্য কোনো ডিভাইসকে হোয়াটসঅ্যাপের সঙ্গে যুক্ত করিয়ে নেয়। এতে আপনার মূল পাসওয়ার্ড না জেনেও অন্য কেউ আপনার সব চ্যাট দেখতে পায়।
সতর্ক থাকার জন্য আপনাকে যা করতে হবে:
১. নিয়মিত লিন্কড ডিভাইস চেক করুন: মাঝেমধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ সেটিংস থেকে Settings > Linked Devices অপশনে যান। সেখানে যদি এমন কোনো ব্রাউজার বা ডিভাইস দেখতে পান যা আপনি চেনেন না, তবে সঙ্গে সঙ্গে সেটির ওপর ট্যাপ করে Log out করে দিন।
২. অপরিচিত কিউআর কোড স্ক্যান করবেন না: কোনো অচেনা বা সন্দেহজনক ওয়েবসাইটের QR Code স্ক্যান করা থেকে বিরত থাকুন।
৩. লিংকিং কোড শেয়ার করবেন না: অচেনা কারও দেওয়া কোনো লিংকিং কোড ব্যবহার করবেন না।
৪. ভুয়া হেল্পডেস্ক থেকে সাবধান: হোয়াটসঅ্যাপের অফিশিয়াল সাপোর্ট টিম পরিচয় দিয়ে কেউ যদি অ্যাকাউন্ট ঠিক করে দেওয়ার নামে QR Code স্ক্যান করতে বা ডিভাইস যুক্ত করতে বলে, তবে কখনোই তা করবেন না। হোয়াটসঅ্যাপ অফিশিয়ালি কখনো এভাবে ব্যবহারকারীর কাছে কোড চায় না।
সিকিউরিটি বাড়াতে আপনার করণীয় (এক নজরে)
আপনার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট শতভাগ নিরাপদ রাখতে নিচের পদক্ষেপগুলো মেনে চলুন:
| সিকিউরিটি ধাপ | কী করবেন? |
| টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন | ছোট পিনের বদলে অক্ষর, সংখ্যা ও চিহ্নের সমন্বয়ে দীর্ঘ পাসওয়ার্ড দিন। |
| পাসকি সেটআপ | ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ফেস আইডি দিয়ে পাসকি চালু করে রাখুন। |
| লিন্কড ডিভাইস চেক | প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার যুক্ত থাকা ডিভাইসগুলোর তালিকা যাচাই করুন। |
| সন্দেহজনক মেসেজ | অপরিচিত কোনো লিংক বা কিউআর কোড স্ক্যান করা থেকে বিরত থাকুন। |
হোয়াটসঅ্যাপের এই নতুন সিকিউরিটি ফিচারগুলো ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে নিশ্চিতভাবেই একটি বাড়তি সুরক্ষার স্তর তৈরি করবে। তবে মনে রাখবেন, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আপনার নিজের সচেতনতাই হলো সাইবার অপরাধীদের থেকে বাঁচার প্রধান হাতিয়ার। তাই আজই আপনার হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাপটি প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোর থেকে আপডেট করে নিন এবং ওপরের নিরাপত্তা ফিচারগুলো চালু করে নিজের অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখুন।




