ইসলামিক হিজরি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় অত্যন্ত বরকতময় মাস হলো রবিউল আউয়াল। বিশ্বের প্রতিটি মুসলিমের হৃদয়ে ও মুসলিম উম্মাহর সুদীর্ঘ ইতিহাসে এই পবিত্র মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন, তাঁর নবুওয়াত লাভ এবং তাঁর সুমহান জীবনের অসংখ্য স্মৃতিঘেরা ঘটনার সঙ্গে এই মাসের নাম চিরতরে জড়িয়ে রয়েছে। তাই প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাস আমাদের সামনে নিয়ে আসে নবুওয়াতের আলোকোজ্জ্বল স্মৃতি এবং প্রিয় নবীজি (সা.)-এর দেখানো সরল-সঠিক পথের শিক্ষা।
এই পবিত্র মাসের সবচেয়ে বড় বার্তা হলো মহানবী (সা.)-এর আদর্শকে নতুন করে উপলব্ধি করা। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে সুন্দরভাবে ঘোষণা করেছেন: ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তার জন্য, যে আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’ (সুরা: আহজাব, আয়াত: ২১)।
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করতে হলে বিশ্বনবীর চরিত্র ও সুন্নাহ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।
বিশ্ব মানবতার জন্য রহমতস্বরূপ মহানবীর (সা.) আগমন
প্রিয় নবীজি (সা.)-এর আগমন মানবজাতির সুদীর্ঘ ইতিহাসে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় ও অনুপম অনুগ্রহ। তিনি কোনো একটি নির্দিষ্ট গোত্র, দেশ বা নির্দিষ্ট কোনো সময়ের জন্য আসেননি; বরং তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন সমগ্র কায়েনাত বা বিশ্বজগতের পরম কল্যাণ ও রহমত হিসেবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: ‘আর আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা: আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭)।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শুভাগমনের পূর্বে পৃথিবী নিমজ্জিত ছিল ঘোর অজ্ঞতা, অন্যায় এবং অন্ধকারের অতল গহ্বরে। সেখান থেকে বিশ্ববাসীকে তাওহিদ বা একত্ববাদের আলোয় নিয়ে আসেন তিনি। তাঁর আনীত জীবনব্যবস্থা মানুষকে শিখিয়েছে কীভাবে স্রষ্টার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়, অসহায় ও সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হয় এবং সমাজে পরম ইনসাফ, ক্ষমা, বিনয় ও নৈতিকতার ভিত্তি স্থাপন করতে হয়।
রবিউল আউয়াল ও মহানবী (সা.)-এর পবিত্র জন্মদিনের ইতিহাস
বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের কাছে রবিউল আউয়াল মাসটি বিশেষভাবে পরিচিত বিশ্বনবী (সা.)-এর জন্মের মাস হিসেবে। তবে তাঁর জন্মের সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও আলেমদের মাঝে সামান্য ভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়। তাই কোনো একটি সুনির্দিষ্ট দিন বা তারিখকে চূড়ান্ত ধরে তর্কে না জড়িয়ে, এই পুরো মাসজুড়ে নবীজির জীবন ও সুন্নাহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা অধিক উত্তম।
সহিহ হাদিসের বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই নিজের জন্মের দিনের কথা স্মরণ করার চমৎকার শিক্ষা আমাদের দিয়েছেন। হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে যখন প্রতি সোমবারের রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তখন তিনি সুন্দর উত্তর দিয়ে বলেন: ‘এ দিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনই আমার ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)। এই পবিত্র হাদিস থেকে এটি স্পষ্ট বোঝা যায় যে, প্রিয় নবীজি (সা.) তাঁর জন্ম ও ওহি প্রাপ্তির স্মৃতিতে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়স্বরূপ প্রতি সোমবারে রোজা পালন করতেন।
নবীজির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের প্রকৃত পথ ও মাধ্যম
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের যে অপার রহমত ও অফুরন্ত নেয়ামত দিয়েছেন, তাতে আনন্দিত হওয়া এবং আনন্দ প্রকাশ করা মুমিনের স্বাভাবিক স্বভাব। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন: ‘বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতের কারণে তারা যেন আনন্দিত হয়; তারা যা সঞ্চয় করে তার চেয়ে এটি পরম উত্তম।’ (সুরা: ইউনুস, আয়াত: ৫৮)।
তবে রাসুল (সা.)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশের মূল চাবিকাঠি হলো তাঁর রেখে যাওয়া সুন্নাহ এবং নীতি-আদর্শ বাস্তব জীবনে কঠোরভাবে মেনে চলা। শুধুমাত্র মুখে ভালোবাসার কথা বলা সহজ, কিন্তু বাস্তব জীবনে তাঁর মতো সত্যবাদী হওয়া, মানুষের প্রতি পরম দয়ালু হওয়া, হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করা এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকার মাধ্যমেই সত্যিকারের ভালোবাসার পরীক্ষা হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় এরশাদ করেছেন: ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও পৃথিবীর সব মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় না হই।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।
রবিউল আউয়াল মাসে আমাদের বিশেষ ও উত্তম করণীয়
রবিউল আউয়াল মাসকে আমরা আমাদের আত্মশুদ্ধি এবং জীবন পরিবর্তনের শুভ সূচনা হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। শরিয়তে প্রমাণিত নয় এমন কোনো নতুন ও মনগড়া প্রথা চালু না করে, কোরআন ও সহিহ সুন্নাহ সমর্থিত আমল বেশি বেশি করা উচিত। নিচে কয়েকটি সহজ ও গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরা হলো:
১. মহানবী (সা.)-এর পূর্ণাঙ্গ সীরাত বা জীবনী পাঠ করা
নবীজি (সা.)-এর মক্কী ও মাদানী জীবনের ত্যাগ, ধৈর্য, সাধারণ মানুষের প্রতি উদারতা, পরিবার পরিচালনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অসামান্য আদর্শ গভীরভাবে অধ্যায়ন করা উচিত। সীরাত পাঠের মাধ্যমে নবীজির প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
২. প্রিয় নবীজি (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেন: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি সালাত পাঠ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করো।’ (সুরা: আহজাব, আয়াত: ৫৬)। এই মাসে প্রতিদিন বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
৩. সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান অর্জন ও অনুসরণ
শুধুমাত্র রাসুল (সা.)-এর জন্ম ও জীবনের কিছু অলৌকিক ঘটনা জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, তাঁর দৈনন্দিন জীবনের হাঁটা-চলা, কথা বলা, ইবাদত এবং লেনদেনের সঠিক সুন্নাহ শিখে নিজের জীবনে তা প্রয়োগ করতে হবে।
৪. নিজ আখলাক ও নৈতিক চরিত্র সংশোধন
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রধান লক্ষ্য ছিল মানবজাতির নৈতিক চরিত্রের পূর্ণতা দান করা। তাই আমাদের কথা ও কাজে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমাশীলতা, বিনয় এবং পরোপকারের গুণাবলি অর্জন করতে হবে।
৫. অন্যান্য নফল ইবাদত বৃদ্ধি করা
নিয়মিত ফরজ ইবাদত পালনের পাশাপাশি বেশি বেশি নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর জিকির, দোয়া এবং সাধ্যমতো দান-সদকা বৃদ্ধি করা উচিত। সোমবার ও বৃহস্পতিবার নফল রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
৬. পরিবার ও সন্তানদের সুন্নাহর আলোয় গড়ে তোলা
নিজের পরিবারের সদস্য ও ছোট ছোট সন্তানদের প্রিয় নবীজি (সা.)-এর ভালোবাসায় গড়ে তুলতে হবে। তাঁদের মহানবীর সুন্দর সুন্দর গল্প ও নৈতিক শিক্ষা শোনানো পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব।
৭. সকল প্রকার বেদাত ও সুন্নাহবিরোধী কাজ ত্যাগ করা
ভালোবাসার নামে দ্বীনের মধ্যে এমন কোনো নতুন প্রথা বা অনুষ্ঠান তৈরি করা উচিত নয়, যার কোনো স্পষ্ট ভিত্তি ইসলামে নেই। প্রতিটি আমল হতে হবে প্রিয় নবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিদের প্রদর্শিত উপায়ে।
রবিউল আউয়াল মাস আমাদের সামনে প্রতি বছর এক মহা বার্তা নিয়ে ফিরে আসে। এটি শুধুই একটি মাসের অতিক্রম নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের গতিপথকে সুন্নাহর আলোয় নতুন করে সাজানোর শুভ ক্ষণ। আসুন, আমরা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে গভীরভাবে জানি, পরম ভালোবাসায় তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করি এবং আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে তাঁর অনুপম আদর্শে সুন্দরভাবে গড়ে তুলি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে সেই তৌফিক ও হেদায়েত দান করুন। আমিন।




