Saturday, October 17, 2026

ডিজিটাল সার্ভিস রপ্তানি: গার্মেন্টসের পর বাংলাদেশের পরের সম্ভাবনা কোথায়?

বহুল পঠিত

গার্মেন্টসের পর বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা সফটওয়্যার, আইটি-সক্ষম সেবা আর ফ্রিল্যান্সিংয়ে, অর্থাৎ যে সেবা ইন্টারনেটে বিদেশে পাঠানো যায়। সরকারি হিসাবে এই খাতের আয় এখনো এক বিলিয়ন ডলারের নিচে। তবে দক্ষ তরুণ জনশক্তি আর বড় বৈশ্বিক বাজার আছে। পেমেন্ট, দক্ষতা আর আয়ের হিসাব রাখার ঘাটতি মেটালে খাতটা দ্রুত বড় হতে পারে।

পোশাকের ওপর নির্ভরতা কতটা, তা এক লাইনেই বোঝা যায়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (EPB) হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট পণ্য রপ্তানি ছিল ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে তৈরি পোশাক একাই ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলার। একটা পণ্যের ওপর এতটা ভর রাখা মানে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা।

ডিজিটাল সার্ভিস রপ্তানি বলতে কী বোঝায়?

যে সেবা জাহাজে না পাঠিয়ে ইন্টারনেটে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটাই ডিজিটাল সার্ভিস রপ্তানি। সফটওয়্যার তৈরি, ডেটা প্রসেসিং, কল সেন্টার, গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েবসাইট বানানো বা বিদেশি ক্লায়েন্টের সোশ্যাল মিডিয়া চালানো, সবই এর মধ্যে পড়ে।

বিশ্বে এটাই এখন সেবা বাণিজ্যের বড় অংশ। UNCTAD-এর (ডিসেম্বর ২০২৪) হিসাবে ২০২৩ সালে ডিজিটালি সরবরাহযোগ্য সেবার বৈশ্বিক রপ্তানি ছিল ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা মোট সেবা রপ্তানির ৫৬ শতাংশ। উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানি সেবছর প্রথমবার এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের ছবিটা ছোট। EPB-র সেবা খাতের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট সেবা রপ্তানি ৬.৯১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কম্পিউটার সেবা ৬২৮.৫০ মিলিয়ন আর ডেটা প্রসেসিং ও হোস্টিংয়ের মতো আইটি-সক্ষম সেবা ৫৫০ মিলিয়ন ডলার।

সরকারি হিসাবে বাংলাদেশ এখন কোথায় দাঁড়িয়ে?

লক্ষ্যের তুলনায় অনেক পেছনে। আয় বাড়ছে, কিন্তু গতি ধীর।

EPB-র বছরওয়ারি হিসাবে আইসিটি সেবা রপ্তানি ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৪৩৬.৬৬ মিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২-এ রেকর্ড ৭৩৮.৭৯ মিলিয়নে ওঠার পর আবার কমে, আর ২০২৪-২৫-এ দাঁড়ায় ৭২৪.৬ মিলিয়ন ডলারে। ২০২৫ সালের জন্য ঠিক করা ৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যের মাত্র ১৪.৫ শতাংশ পূরণ হয়েছে।

কোন খাতে সম্ভাবনা সবচেয়ে স্পষ্ট?

তিনটি খাতে: সফটওয়্যার ও আইটি সেবা, আইটি-সক্ষম সেবা, আর ফ্রিল্যান্সিং। প্রতিটির চাহিদা আর প্রস্তুতি আলাদা।

সফটওয়্যার ও আইটি সেবা

বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাস্টম সফটওয়্যার, অ্যাপ আর ওয়েব প্ল্যাটফর্ম বানানো এই খাতের মূল কাজ। এখানে একটা চুক্তির অঙ্ক বড়, তবে ক্লায়েন্টের আস্থা পেতে সময় লাগে, আর দরকার হয় প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক রেকর্ড।

আইটি-সক্ষম সেবা

ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সাপোর্ট, হিসাবরক্ষণ আর কনটেন্ট মডারেশনের মতো কাজে প্রবেশের বাধা কম। কম্পিউটার চালানো আর ইংরেজিতে যোগাযোগের দক্ষতা থাকলেই শুরু করা যায়, তাই জেলা শহরেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। তবে এ ধরনের কাজে ঘণ্টাপ্রতি আয় তুলনামূলক কম, তাই শুরু থেকেই উঁচু দক্ষতার কাজে ওঠার পরিকল্পনা রাখা ভালো।

ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল মার্কেটিং

সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত Social Security Policy Support (SSPS) প্রোগ্রামের ২০২৬ সালের একটি উপস্থাপনা আইসিটি বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, দেশে সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার। একই উপস্থাপনার আনুমানিক হিসাবে তাঁদের কাজের ৩৫ শতাংশ ওয়েব ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে, ২৫ শতাংশ ক্রিয়েটিভ ও ডিজাইনে, আর ২০ শতাংশ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে।

ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কাজ করা ফ্রিল্যান্সার আর রিসেলারদের জন্য দেশি টুলও তৈরি হয়েছে। যেমন Smmfollowom-এর বাংলাদেশ এসএমএম প্যানেল সার্ভিস-এ দাম টাকায়, আর পেমেন্ট হয় বিকাশ, নগদ বা রকেটে, তাই ডলার কার্ড ছাড়াই কাজ শুরু করা যায়। সেখানে API সংযোগ বিনামূল্যে, ফলে নিজের প্যানেল থেকে ক্লায়েন্টের অর্ডার স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রসেস করা যায়।

তবে বিদেশি ক্লায়েন্টকে কী দিচ্ছেন, তা পরিষ্কার জানা দরকার। প্যানেল একটা প্রোফাইলে প্রাথমিক সংখ্যা যোগ করে, নতুন পেজকে কম ফাঁকা দেখায়। এটা আসল ক্রেতা, সত্যিকারের এনগেজমেন্ট বা অনুগত অডিয়েন্স তৈরি করে না। 

কোন বাধাগুলো সম্ভাবনাকে আটকে রাখছে?

বাধা মূলত পাঁচটি: আয়ের বড় অংশ সরকারি হিসাবে ওঠে না, বিনিয়োগ কম, ব্যাংকিং সহায়তা দুর্বল, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট জটিল, আর দক্ষতায় ফারাক আছে।

•        হিসাবের বাইরে আয়: নভেম্বর ২০২৫-এ BASIS-এর সাবেক সভাপতি হাবিবুল্লাহ নেয়ামুল করিম বলেছেন, ফ্রিল্যান্সার আর ছোট আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের আয় যোগ করলে প্রকৃত অঙ্ক এক বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে।

•        বিনিয়োগ: তাঁর হিসাবে, ৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানিতে পৌঁছাতে অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ লাগবে। বড় দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী এখনো দ্রুত মুনাফার উৎপাদন খাতকেই বেছে নেয়।

•        ব্যাংকিং সহায়তা: আইটি উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বিদেশি কাজের ব্যাংক গ্যারান্টি পেতে ব্যাংক ১০০ শতাংশ মার্জিন চায়।

•        পেমেন্ট: জুন ২০২৬-এ সংসদে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, PayPal চালুর জন্য সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক ও PayPal কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সেবাটা এখনো চালু হয়নি।

•        দক্ষতা: নেয়ামুল করিমের কথায়, প্রতি বছর ৮০ থেকে ৯০ হাজার প্রকৌশল স্নাতক চাকরির বাজারে আসেন, অথচ তাঁদের অনেকেই বেকার থাকেন। এটা শিক্ষা আর শিল্পের চাহিদার অমিল দেখায়।

পোশাক খাতের সাথে ডিজিটাল সেবার মূল পার্থক্য কী?

পোশাক রপ্তানিতে লাগে কারখানা, আমদানি করা কাঁচামাল, বন্দর আর জাহাজ। ডিজিটাল সেবায় লাগে দক্ষ মানুষ, একটা কম্পিউটার আর স্থিতিশীল ইন্টারনেট।

এই পার্থক্যের দুটো দিক আছে। ভালো দিক হলো, কাঁচামাল আমদানি করতে হয় না বলে আয়ের বড় অংশ দেশেই থাকে, আর বন্দরের জট বা জাহাজ ভাড়ার ওঠানামা কাজ আটকায় না। কঠিন দিক হলো, এখানে প্রতিযোগিতা সরাসরি বিশ্বজুড়ে। ঢাকার একজন ডিজাইনার একই কাজের জন্য প্রতিযোগিতা করেন ভারত, ফিলিপাইন বা পূর্ব ইউরোপের কারও সাথে।

আরেকটা চ্যালেঞ্জ এআই। সাধারণ ডেটা এন্ট্রি বা সহজ অনুবাদের মতো যে কাজ এআই টুল নিজেই করতে পারে, সেখানে মানুষের কাজের চাহিদা কমার ঝুঁকি আছে। তাই টিকে থাকার পথ হলো এমন দক্ষতা, যেখানে বিচার-বিবেচনা আর ক্লায়েন্ট বোঝার ক্ষমতা লাগে।

গার্মেন্টসের মতো বড় হতে কী বদলানো দরকার?

আয়কে আনুষ্ঠানিক পথে আনা, ফ্রিল্যান্সারদের স্বীকৃতি দেওয়া আর দক্ষতাকে বাজারের চাহিদার সাথে মেলানো। এই তিনটি না হলে সম্ভাবনা কাগজেই থেকে যাবে।

স্বীকৃতির কাজ শুরু হয়েছে। জানুয়ারি ২০২৬-এ আইসিটি বিভাগ আর আইসিটি অধিদপ্তর সরকারি ফ্রিল্যান্সার আইডি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। প্ল্যাটফর্মটির ভাষ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ব্যাংকিং সেবা, আর্থিক প্রণোদনা আর প্রশিক্ষণ পাওয়া সহজ করাই এই আইডির লক্ষ্য।

Tiger IT-এর রিফাত আবেদিনের মতো উদ্যোক্তারা বলছেন, পোশাক খাত যে নীতি সহায়তা পায়, আইটি খাত তা পায় না। ফ্রিল্যান্সারের পক্ষেও কিছু কাজ আছে: আয় ব্যাংকিং চ্যানেলে আনা, যাতে দেশের হিসাবে তা রপ্তানি হিসেবে ওঠে, আর একটা নির্দিষ্ট দক্ষতায় গভীর হওয়া। দশটা কাজ অল্প অল্প জানার চেয়ে একটা কাজে বিশেষজ্ঞ হওয়া বিদেশি ক্লায়েন্টের কাছে বেশি মূল্য পায়।

শেষ কথা

ডিজিটাল সার্ভিস রাতারাতি পোশাকের জায়গা নেবে না, তবে রপ্তানির দ্বিতীয় পা হিসেবে এর চেয়ে প্রস্তুত খাত কমই আছে। পেমেন্টের পথ খোলা, আয় হিসাবে তোলা আর দক্ষতায় বিনিয়োগ, এই তিন কাজ একসাথে এগোলে সম্ভাবনাটা সংখ্যায় দেখা যাবে।

আরো পড়ুন

তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনা জামানতে ২০ লাখ টাকা ঋণ: আবেদন করবেন যেভাবে

বাংলাদেশে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে এক দারুণ পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে আরও গতিশীল করতে এবং...

বিশ্বসেরা ৫০০ ব্যাংকের তালিকায় বাংলাদেশের ব্র্যাক ব্যাংক: দেশের ব্যাংকিং খাতের নতুন ইতিহাস

বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস প্রকাশ করেছে ‘ওয়ার্ল্ডস টপ পারফর্মিং ব্যাংকস ২০২৬’-এর আন্তর্জাতিক তালিকা। বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টার সহায়তায় তৈরি করা এই তালিকায় স্থান...

জরুরি সেবার বিল দিতে অ্যাপে পাওয়া যাবে ১০ হাজার টাকা ঋণ: জেনে নিন পাওয়ার নিয়ম

বর্তমান ডিজিটাল যুগে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সহজ করতে ব্যাংকিং খাতে যুক্ত হচ্ছে নিত্যনতুন প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বড় চ্যালেঞ্জ হলো হঠাৎ করে...
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ