আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মডার্না। ক্যানসার চিকিৎসায় তাদের তৈরি ব্যক্তিকেন্দ্রিক এমআরএনএ ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তৃতীয় ধাপে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মেলানোমা অপসারণের পর রোগীদের ক্ষেত্রে এই ভ্যাকসিনটি ক্যান্সার ফিরে আসা বা মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে। পেমব্রোলিজুম্যাব নামক ইমিউনোথেরাপির ওষুধের সঙ্গে ব্যবহার করা এই বিশেষ টিকা প্রতিটি রোগীর টিউমারের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়, যা চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব মাইলফলক।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অভাবনীয় সাফল্য ও কার্যকারিতা
ইউরোপিয়ান সোসাইটি ফর মেডিকেল অনকোলজির বার্ষিক কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ভ্যাকসিনের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়েছে। ট্রায়ালের তথ্য অনুযায়ী:
- ইনটিসমেরান নামের এই চিকিৎসামূলক ভ্যাকসিনটি পেমব্রোলিজুম্যাব ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে প্রয়োগ করা হয়েছিল।
- চিকিৎসা নেওয়ার দুই বছর পর ৮২ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসারমুক্ত থাকার পাশাপাশি রোগের পুনরাবৃত্তি ছাড়াই বেঁচে থাকার হার বজায় ছিল।
- দূরবর্তী অঙ্গে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি ছাড়াই বেঁচে থাকার হার ছিল ৮৮.৫ শতাংশ যা প্রায় ১০ জন রোগীর মধ্যে ৯ জনের ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ফল নিশ্চিত করেছে।
- সামগ্রিক মূল্যায়নে এই ভ্যাকসিন ক্যান্সার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
কীভাবে কাজ করে এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্যান্সার ভ্যাকসিন?
প্রতিটি মানুষের টিউমারের গঠন ও কোষের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হয়। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ইনটিসমেরান ভ্যাকসিনটি প্রতিটি রোগীর টিউমারের জিনেটিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলাদাভাবে প্রস্তুত করা হয়।
ক্যান্সার কোষের পৃষ্ঠে কিছু অস্বাভাবিক প্রোটিন থাকে, যা একেকটি কোষের জন্য আলাদা পরিচয়চিহ্নের মতো কাজ করে। এমআরএনএ প্রযুক্তি এই প্রোটিনগুলোর বৈশিষ্ট্য নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে রোগীর নিজস্ব রোগপ্রতিরোধী বা ইমিউন সিস্টেমকে সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রশিক্ষণ দেয়। গবেষণাটির প্রধান তদন্তকারী ও বিশিষ্ট ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জর্জিনা লং এই প্রযুক্তিকে ইমেইলের আবিষ্কারের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, এটি যোগাযোগব্যবস্থার মতো ক্যানসার চিকিৎসাপদ্ধতিকেও সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।
মেলানোমা থেকে অন্যান্য ক্যান্সারের চিকিৎসার সম্ভাবনা
মেলানোমা হলো ত্বকের এক ধরনের মারাত্মক ক্যান্সার, যা মেলানিন উৎপাদনকারী কোষ থেকে সৃষ্টি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস বলছে, মেলানোমা চিকিৎসায় অর্জিত সাফল্য অতীতে ফুসফুস, কিডনি, মাথা ও ঘাড় এবং মূত্রথলিসহ নানা ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় বিপ্লব এনেছে। গবেষকদের মতে, এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ ভবিষ্যতে অন্যান্য জটিল ক্যানসারের চিকিৎসাকেও সহজতর করে তুলবে।
১,১৩৭ জন রোগীর ওপর দীর্ঘ পরীক্ষা ও বৈশ্বিক গবেষণা
বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি কেন্দ্রে এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালিত হয়েছে, যাতে অংশ নেন মোট ১,১৩৭ জন উচ্চঝুঁকিতে থাকা রোগী। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মেলানোমা অপসারণের পর যাদের ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ছিল, তাদের ওপরই এই পরীক্ষা চালানো হয়। এই ট্রায়ালের নেতৃত্ব দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার মেলানোমা ইনস্টিটিউটের মেডিকেল ডিরেক্টর এবং সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জর্জিনা লং। এই অভাবনীয় সাফল্যের খবর প্রকাশ পাওয়ার পর মডার্নার শেয়ারের দাম ১৭০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, যা চিকিৎসা বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
রোগীরা কবে নাগাদ এই ভ্যাকসিন হাতে পাবেন?
সাধারণ রোগীদের জন্য এই জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিনটি সহজলভ্য করার আগে এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কঠোর পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সংস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়ার পরই কেবল চিকিৎসাক্ষেত্রে এটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
ক্যানসার চিকিৎসার দীর্ঘ ইতিহাসে রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থাকে এত নিখুঁত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক উপায়ে কাজে লাগানোর সাফল্য এর আগে খুব একটা দেখা যায়নি। মডার্নার এই এমআরএনএ ভ্যাকসিন শুধু মেলানোমা আক্রান্তদের জন্যই নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য ক্যানসার জয়ের এক নতুন ও উজ্জ্বল দিগন্ত উন্মোচন করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেলে এটি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম যুগান্তকারী অস্ত্র হয়ে উঠবে।




