ইসলাম কেবল কিছু নির্দিষ্ট ইবাদতের নাম নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। একজন মানুষের মর্যাদা শুধু তার সালাত বা সিয়ামের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না; বরং তার ইমান, সুন্দর চরিত্র, মানুষের প্রতি ব্যবহার, সততা, দানশীলতা এবং সমাজকল্যাণে ভূমিকার মাধ্যমেও নির্ধারিত হয়।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বিভিন্ন সময় তাঁর সহিহ হাদিসে এমন কিছু মানুষের প্রশংসা করেছেন, যাদের গুণাবলী একজন মুমিনের আদর্শ চরিত্র গঠনের মূল ভিত্তি। আসুন, সহিহ কুরআন ও সুন্নাহর আলোতে সেই মহান ১২ শ্রেষ্ঠ মানুষের কথা জেনে নিই।
১. কুরআন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী
ইসলামে কুরআন শিক্ষা করা এবং তা অন্যকে শেখানোর গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই কাজটিকে সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
- হাদিস: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।” (সহিহ বুখারি: ৫০২৭)
অঙ্ক বা বিজ্ঞানের শিক্ষার চেয়ে আল্লাহর বাণী শেখা এবং তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াই সবচেয়ে বড় কাজ।
২. উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি
সুন্দর ও মার্জিত আচরণ একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। যার আখলাক বা চরিত্র ভালো, সে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।
- হাদিস: প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।” (সহিহ বুখারি: ৩৫৫৯, সহিহ মুসলিম: ২৩২১)
৩. ঋণ পরিশোধে যিনি বিশ্বস্ত ও উত্তম
অর্থনৈতিক লেনদেনে সততা বজায় রাখা ইমানের অন্যতম পরিচয়। ঋণ নিয়ে তা সময়মতো বা সুন্দরভাবে পরিশোধ করা বড় একটি গুণ।
- হাদিস: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যে ঋণ পরিশোধে সবচেয়ে উত্তম।” (সহিহ বুখারি: ২৩৯৩, সহিহ মুসলিম: ১৬০১)
৪. যার ক্ষতি থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে
প্রকৃত মুমিন মানুষের নিরাপত্তার উৎস হন। যার উপস্থিতিতে মানুষ শান্তি পায় এবং ভয় পায় না, সে-ই সেরা।
- হাদিস: বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, “সর্বোত্তম মানুষ সে, যার কাছ থেকে সবাই কল্যাণের আশা করে এবং যার অনিষ্ট বা ক্ষতি থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে।” (জামে আত-তিরমিজি: ২২৬৩)
৫. পরিবারের সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণকারী
বাইরের মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করা সহজ, কিন্তু ঘরের মানুষের সাথে ধৈর্য ও ভালোবাসার পরিচয় দেওয়াই আসল শ্রেষ্ঠত্ব।
- হাদিস: মহানবী (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।” (জামে আত-তিরমিজি: ৩৮৯৫)
৬. দীর্ঘ জীবন ও উত্তম আমলকারী ব্যক্তি
আল্লাহর দেওয়া আয়ু বা জীবন বড় নিয়ামত। তবে এই দীর্ঘ জীবনকে যদি সৎকাজে লাগানো যায়, তবেই তা সার্থক।
- হাদিস: রাসুল (সা.)-কে সেরা মানুষ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “সর্বোত্তম মানুষ সে-ই, যার জীবন দীর্ঘ হয় এবং আমল বা কাজ ভালো হয়।” (জামে আত-তিরমিজি: ২৩৩০)
৭. মানুষের উপকারে নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি
অন্য মানুষের সেবা ও উপকার করা ইসলামের অন্যতম মূল শিক্ষা। অহংকার ভুলে অন্যের পাশে দাঁড়ানোই ইমানের পরিচয়।
- হাদিস: প্রিয় নবী (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “সর্বোত্তম মানুষ সে-ই, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।” (আল-মু’জামুল আওসাত: ৫৯৩৭)
৮. পরিচ্ছন্ন অন্তর ও সত্যবাদী জিহবার অধিকারী
যার মনে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ নেই এবং যে মুখে সবসময় সত্য কথা বলে, রাসুল (সা.) তাকে শ্রেষ্ঠ মানুষের মর্যাদা দিয়েছেন।
- হাদিস: সাহাবিরা রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, “বিশুদ্ধ অন্তরের ব্যক্তি কে?” তিনি বললেন, “সে হলো পূত-পবিত্র নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ, যার কোনো গুনাহ নেই, নেই কোনো দুশমনি, হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার ও কপটতা।” (সুনান ইবনে মাজাহ: ৪২১৬)
৯. প্রতিবেশী ও সঙ্গীর প্রতি যত্নশীল মানুষ
আমরা যাদের সাথে চলি বা আমাদের চারপাশে যারা থাকেন, তাদের সাথে ভালো আচরণ করা আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার উপায়।
- হাদিস: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম সঙ্গী সে, যে তার সঙ্গীর জন্য ভালো। আর সর্বোত্তম প্রতিবেশী সে, যে তার প্রতিবেশীর জন্য উত্তম।” (জামে আত-তিরমিজি: ১৯৪৪)
১০. রাগ সংবরণকারী ও ক্ষমাকারী
অন্যায় দেখেও রাগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেওয়া মহৎ হৃদয়ের লক্ষণ।
- কুরআনের ঘোষণা: আল্লাহ তাআলা বলেন, “যারা নিজেদের ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আল্লাহ নিশ্চয়ই এমন সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” (সুরা আল-ইমরান: ১৩৪)
১১. অন্নদানকারী ও সালাম প্রচারকারী
ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়ার অভ্যাস সমাজকে সুন্দর করে তোলে।
- হাদিস: রাসুল (সা.) বলেছেন, “তুমি মানুষকে খাদ্য খাওয়াবে এবং চেনা-অচেনা সবাইকে সালাম দেবে।” (সহিহ বুখারি: ২৮)
১২. আল্লাহর পথে ত্যাগ স্বীকারকারী মুমিন
নিজের জীবন, সময়, শ্রম ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে যাওয়া ব্যক্তি ঈমানের সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করেন।
- হাদিস: এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, “কোন মানুষ সর্বোত্তম?” রাসুল (সা.) বললেন, “সেই মুমিন, যে আল্লাহর পথে নিজের জান ও মাল দিয়ে সংগ্রাম করে।” (সহিহ বুখারি: ২৭৮৬)
আমাদের করণীয়
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কেবল ইবাদতের নিয়মকানুনই শেখাননি, তিনি একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ গঠনের জন্য দরকারি গুণাবলী শিখিয়ে গেছেন। কুরআন শিক্ষা, উত্তম চরিত্র, সততা, পরিবার ও প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব পালন, ক্ষমাশীলতা এবং মানুষের উপকার করা এগুলোই একজন আদর্শ মুসলিমের মূল শক্তি।
চলুন, আমরা কেবল এই গুণগুলোর কথা পড়ে থেমে না থেকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এগুলো চর্চা করার দৃঢ় সংকল্প করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ মেনে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।




