আমরা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত পরিষ্কার করার জন্য যে টুথপেস্ট ব্যবহার করি, তার মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি। পরিচ্ছন্ন ও ঝকঝকে হাসির পেছনে অজান্তেই কি আমরা বিষাক্ত প্লাস্টিক পেটে গিলে ফেলছি?
পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার (ইএসডিও) সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বাজারে থাকা প্রচলিত টুথপেস্টের বড় একটি অংশেই ছড়িয়ে আছে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক। পরীক্ষা করা প্রায় চারটির মধ্যে তিনটি টুথপেস্টেই এই মারাত্মক বিষের প্রমাণ মিলেছে। তবে একই গবেষণায় আশার খবরও এসেছে কিছু পরিচিত টুথপেস্টে একেবারেই কোনো প্লাস্টিকের কণা পাওয়া যায়নি।
আপনার ব্যবহৃত টুথপেস্টটি নিরাপদ কি না এবং এই বিষয়ে ইএসডিও-র গবেষণায় ঠিক কী কী তথ্য উঠে এসেছে, চলুন সহজ ভাষায় বিস্তারিত জেনে নিই।
গবেষণায় উঠে এল ভয়ংকর তথ্য
ইএসডিও-র এই গবেষণাটি জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি ল্যাবরেটরিতে’ পরিচালিত হয়। দেশের বিভিন্ন সুপারশপ, খুচরা দোকান ও পাইকারি বাজার থেকে ১৯টি দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের মোট ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল।
গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা যায়:
- পরীক্ষা করা ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতেই (প্রায় ৭৬.৫ শতাংশ) মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
- প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০টি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩২০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।
- বাংলাদেশে উৎপাদিত ২৫টি টুথপেস্টের নমুনার মধ্যে ২২টিতেই প্লাস্টিক উপাদান রয়েছে।
- বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে ভিয়েতনামের ২টির মধ্যে ২টি, থাইল্যান্ডের ২টি নমুনার ১টি এবং ভারতের ৫টির মধ্যে ১টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে মেডিপ্লাস ফ্লুরাইড জেল-এ (৩২০টি)। এছাড়া ক্লোজআপ রেড হট ও ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ-এ ১৬০টি করে এবং শিশুদের কোডোমো আল্ট্রা শিল্ড ফর্মুলায় ১৪০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
যে ৮টি টুথপেস্টে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি
গবেষণার এই উদ্বেগজনক তথ্যের মাঝেও স্বস্তির খবর হলো, পরীক্ষা করা ৩৪টির মধ্যে ৮টি টুথপেস্টে একেবারেই কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়নি। অর্থাৎ এগুলোতে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব নেই।
প্লাস্টিকমুক্ত সেই ৮টি নিরাপদ টুথপেস্টের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. জেনফ্রেশ (দেশীয় ব্র্যান্ড)
২. প্যারাসুট জাস্ট ফর বেবি – ম্যাঙ্গো ফ্লেভার (দেশীয় ব্র্যান্ড)
৩. ক্লোজআপ রেড-হট জিংক ফ্রেশ টেকনোলজি (দেশীয় ব্র্যান্ড)
৪. প্যারোডনট্যাক্স এক্সপার্ট গাম কেয়ার (ভারত)
৫. সেনসোডাইন ফ্রেশ জেল (ভারত)
৬. কোলগেট ম্যাক্সফ্রেশ (ভারত)
৭. কোলগেট অ্যাক্টিভ সল্ট (ভারত)
৮. কোডোমো অরেঞ্জ টুথপেস্ট (থাইল্যান্ড)
শিশুদের টুথপেস্ট নিয়েও বাড়তি দুশ্চিন্তা
ছোট শিশুরা অনেক সময়ই ব্রাশ করার সময় পেস্ট গিলে ফেলে। গবেষণায় শিশুদের জন্য বিশেষভাব তৈরি ৬টি টুথপেস্টের নমুনাও পরীক্ষা করা হয়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এর মধ্যে ৪টি ব্র্যান্ডেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
তবে স্বস্তির বিষয়, শিশুদের ব্যবহৃত প্যারাসুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো) এবং কোডোমো অরেঞ্জ টুথপেস্টে কোনো প্লাস্টিক কণা মেলেনি। তাই শিশুদের জন্য টুথপেস্ট কেনার আগে অভিভাবকদের এখন থেকে অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে।
প্যাকেটের মোড়কে নেই কোনো তথ্য
ইএসডিওর গবেষণায় আরও একটি বড় অসঙ্গতি সামনে এসেছে। কোনো টুথপেস্টের মোড়ক বা লেবেলে এটি যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ধারণ করছে কিংবা এতে কী ধরনের কৃত্রিম পলিমার ব্যবহার করা হয়েছে তার কোনো তথ্য উল্লেখ করা থাকে না।
এর ফলে সাধারণ ক্রেতারা না জেনেই এসব ক্ষতিকর উপাদান কিনছেন এবং নিজের অজান্তেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। আবার বাধ্যতামূলক কোনো নিয়ম না থাকায় বাজার তদারকি করতেও সমস্যা হচ্ছে।
ক্রেতাদের সচেতনতার হার এখনো কম
সারাদেশে প্রায় ২,৭৬০ জন সাধারণ মানুষের ওপর করা এক জরিপে জানা যায়:
- প্রায় ৪১.৯ শতাংশ মানুষ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার বিষয়ে কখনোই কিছু শোনেননি।
- ৩১.৩ শতাংশ মানুষ শুনে থাকলেও বিস্তারিত কিছু জানেন না।
- মাত্র ২৬.৯ শতাংশ মানুষ এই বিষয়ে পুরোপুরি সচেতন।
বাংলাদেশে টুথপেস্টে ক্ষতিকর প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ে এটাই প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা। বর্তমানে এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সরকারি মানদণ্ড বা বাধ্যতামূলক লেবেলিং নীতিমালা নেই, যা দ্রুত প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করার মতো একটি স্বাভাবিক স্বাস্থ্যভ্যাসের মাধ্যমে যদি আমাদের শরীরে মারাত্মক বর্জ্য ও প্লাস্টিক প্রবেশ করে, তবে তা সত্যিই উদ্বেগের বিষয়। এখন পর্যন্ত যেসব পেস্টে এই কণা পাওয়া যায়নি, সেগুলো ব্যবহারের দিকে নজর দেওয়া দরকার। পাশাপাশি সরকারের উচিত টুথপেস্টের মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন চালু করা, যাতে ভোক্তারা জেনে-বুঝে নিরাপদ পণ্য কিনতে পারেন।
আপনার ব্যবহৃত টুথপেস্টটি নিরাপদ তো? আজই তালিকা দেখে মিলিয়ে নিন এবং পরিবারের সবাইকে সচেতন করুন।




