আমাদের জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন হঠাৎ করেই শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। প্রচণ্ড ঠান্ডা লাগলে, ভয়ের কোনো সিনেমা দেখলে, তীব্র উত্তেজনায় কিংবা প্রিয় কোনো গান শোনার সময় অনেকেরই গায়ে কাঁটা দেয়। সাধারণ ভাষায় আমরা একে ‘গায়ে কাঁটা দেওয়া’ বললেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর একটি সুনির্দিষ্ট নাম রয়েছে। চিকিৎসকরা এই ঘটনাকে বলেন ‘পাইলোইরেকশন’ (Piloerection)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মানবদেহের একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া। বাহ্যিক পরিবেশ বা ভেতরের আবেগের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের শরীর কীভাবে সাড়া দেয়, এটি তারই একটি অন্যতম উদাহরণ।
গায়ে কাঁটা দেওয়ার পেছনে স্নায়ুতন্ত্রের ভূমিকা
বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, গায়ে কাঁটা দেওয়ার পুরো বিষয়টি মূলত আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের জটিল কার্যক্রমের ফল। আমাদের ত্বকের ঠিক নিচে থাকা বিশেষ কোষগুলো যখনই পরিবেশের কোনো পরিবর্তন, ভয় কিংবা উত্তেজনার সংকেত পায়, তখন তারা দ্রুত স্নায়ুর মাধ্যমে সেই খবর মস্তিষ্কে পাঠিয়ে দেয়।
সংকেত পাওয়ার সাথে সাথে আমাদের শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি বিশেষ অংশ, যাকে ‘সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ বলা হয়, তা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সিস্টেমটি সক্রিয় হওয়ার পর ত্বকের নিচে থাকা অতি ক্ষুদ্র পেশিগুলোকে সংকুচিত হওয়ার নির্দেশ দেয়। আর তখনই আমাদের শরীরে এই পরিবর্তনটি দৃশ্যমান হয়।
‘অ্যারেক্টর পিলি’ পেশি ও লোম খাড়া হওয়ার রহস্য
আমাদের শরীরের প্রতিটি লোমকূপের গোড়ায় একটি করে অতি ক্ষুদ্র পেশি থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই ক্ষুদ্র পেশিটিকে বলা হয় ‘অ্যারেক্টর পিলি’ (Arrector Pili)। গায়ে কাঁটা দেওয়ার মূল রহস্য লুকিয়ে আছে এই পেশির মধ্যেই।
- পেশির সংকোচন: যখনই সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম থেকে সংকেত আসে, তখন এই অ্যারেক্টর পিলি পেশিগুলো হঠাৎ সংকুচিত বা টানটান হয়ে যায়।
- লোম খাড়া হওয়া: পেশিগুলো সংকুচিত হওয়ার কারণে লোমকূপের গোড়াটি সোজা হয়ে যায়, যার ফলে শরীরের লোমগুলো খাড়া দেখায়।
- ত্বকের পরিবর্তন: লোম খাড়া হওয়ার পাশাপাশি লোমের চারপাশের ত্বক কিছুটা ফুলে ওঠে ছোট ছোট দানার মতো রূপ নেয়। এটি দেখতে অনেকটা চামড়া ছাড়ানো মুরগির ত্বকের মতো লাগে বলে ইংরেজি পরিভাষায় একে ‘গুজবাম্পস’ (Goosebumps)-ও বলা হয়।
ঠান্ডা আবহাওয়া এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ
ঠান্ডা লাগলে গায়ে কাঁটা দেওয়াটা আমাদের শরীরের একটি আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা। আদিমকাল থেকেই স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরে এই প্রক্রিয়াটি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে আসছে।
যখন তীব্র ঠান্ডা পড়ে, তখন লোম খাড়া হওয়ার মাধ্যমে ত্বকের ঠিক ওপরে বাতাসের একটি পাতলা ও অদৃশ্য স্তর তৈরি হয়। এই বায়ুস্তরটি শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা বা ওমকে সহজে বাইরে বেরিয়ে যেতে বাধা দেয় এবং বাইরের ঠান্ডাকে ভেতরে ঢুকতে দেয় না।
একটি মজার তথ্য: বিবর্তনের ধারায় আদিম মানুষের তুলনায় আধুনিক মানুষের শরীরে লোমের পরিমাণ অনেক কম। তাই বর্তমান মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে খুব বেশি কার্যকর ভূমিকা না রাখলেও, এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের বিবর্তনের একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে আজও আমাদের শরীরে রয়ে গেছে।
আবেগ, উত্তেজনা ও অ্যাড্রিনালিন হরমোনের প্রভাব
শুধু যে ঠান্ডা বা ভয়ের কারণেই গায়ে কাঁটা দেয়, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় তীব্র মানসিক আবেগ বা ভালো লাগার মুহূর্তগুলোতেও আমাদের শরীরে এমন শিহরণ তৈরি হতে পারে। যেমন:
- নিজের খুব প্রিয় বা আবেগপূর্ণ কোনো গান শোনার সময়।
- সিনেমা বা নাটকের কোনো চমৎকার ও স্পর্শকাতর দৃশ্য দেখার সময়।
- হঠাৎ কোনো বড় সাফল্য বা তীব্র আনন্দের খবর পেলে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের তীব্র মানসিক ও আবেগঘন মুহূর্তে আমাদের শরীরে ‘অ্যাড্রিনালিন’ (Adrenaline) নামের একটি বিশেষ হরমোনের নিঃসরণ বা প্রবাহ হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে যায়। এই হরমোনটি মূলত শরীরকে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করে। আর এই হরমোনের প্রভাবেই অ্যারেক্টর পিলি পেশি সংকুচিত হয় এবং আমাদের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন?
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গায়ে কাঁটা দেওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং একটি সাধারণ শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া। এটি নিয়ে ভয়ের বা চিন্তার কোনো কারণ নেই।
তবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। যদি কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই (অর্থাৎ ঠান্ডা, ভয়, গান বা উত্তেজনা ছাড়াই) বারবার এবং নিয়মিত গায়ে কাঁটা দিতে থাকে, কিংবা এর সাথে অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা বা উপসর্গ (যেমন অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরানো বা বুক ধড়ফড় করা) দেখা দেয়, তবে অবহেলা না করে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।




