দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরণের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এবার ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর (Sommilito Islami Bank) শীর্ষ স্থানীয় পদগুলোতে নিয়োগের সুযোগ পেতে যাচ্ছেন সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এতদিন যা ভাবা কঠিন ছিল, সরকারের নতুন নীতিমালায় সেটিই এখন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।
রবিবার (১৮ জানুয়ারি, ২০২৬) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডি, ডিএমডি ও জিএম পদে নিয়োগ ও পদায়ন নীতিমালা ২০২৬’ শীর্ষক এই নীতিমালায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদের জন্য যোগ্যতা ও শর্তাবলী স্পষ্ট করা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নতুন সুযোগ
নতুন এই নীতিমালার ফলে সরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের কর্মকর্তারা এখন ইসলামী ব্যাংকিং ধারার এই নতুন প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী পদে আসার সুযোগ পাবেন। সরকারের লক্ষ্য হলো, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ব্যাংকটির কার্যক্রমকে আরও গতিশীল এবং স্বচ্ছ করা। তবে এই পদে আসতে হলে প্রার্থীদের কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
এমডি বা সিইও পদে নিয়োগের যোগ্যতা ও শর্ত
ব্যাংকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। এই পদে নিয়োগ দেওয়া হবে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে।
মূল শর্তসমূহ:
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: প্রার্থীকে অবশ্যই স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে। অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ফাইন্যান্স, ব্যাংকিং, ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবসায় প্রশাসনে ডিগ্রি থাকলে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শিক্ষাজীবনে কোনো তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য নয়।
- অভিজ্ঞতা: ব্যাংকিং খাতে অন্তত ২০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। প্রার্থীকে বর্তমানে কোনো ব্যাংকের সিইও হিসেবে কর্মরত থাকতে হবে অথবা অব্যবহিত পূর্বের পদে কমপক্ষে দুই বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
- বয়সসীমা: ৪৫ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে হতে হবে।
- বিশেষ দক্ষতা: শরিয়াহ্সম্মত ব্যাংকিং, শরিয়াহ্ গভর্ন্যান্স, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট এবং ইসলামিক ফাইন্যান্স সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা বাধ্যতামূলক। ব্যাংক একীভূতকরণ বা অধিগ্রহণ (M&A) বিষয়ক অভিজ্ঞতা থাকলে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে।
নিয়োগটি হবে তিন বছরের চুক্তভিত্তিক এবং এর জন্য জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
ডিএমডি ও জিএম পদে কারা সুযোগ পাবেন?
এমডি পদের পাশাপাশি উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদের জন্যও সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে।
উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)
ডিএমডি পদের জন্য প্রার্থীর অন্তত ১৯ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অব্যবহিত পূর্বের পদে দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতাসহ বয়স হতে হবে ৪৫ থেকে ৬২ বছরের মধ্যে। ইসলামী ব্যাংকিং ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকা এই পদের জন্যও আবশ্যক।
মহাব্যবস্থাপক (জিএম)
জিএম পদে নিয়োগের ক্ষেত্রটি কিছুটা ভিন্ন। এখানে সরাসরি নিয়োগের পাশাপাশি বদলির সুযোগও রাখা হয়েছে।
- রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকে কর্মরত জিএম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এখানে বদলি করা যাবে।
- এছাড়া বিলুপ্ত হওয়া বা একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো (যেমন: ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, এক্সিম, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক) এর সমপর্যায়ের যোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেও জিএম নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে।
- এই পদের জন্য ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা এবং সর্বোচ্চ ৬০ বছর বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কঠোর বিধিনিষেধ ও সাত ধাপের বাছাই প্রক্রিয়া
ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে নীতিমালায় নৈতিকতার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো প্রার্থী ঋণখেলাপি হন, কোনো ধরণের আর্থিক অনিয়মে জড়িত থাকেন, কিংবা আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত হন, তবে তিনি আবেদনের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এছাড়াও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ, সাইবার নিরাপত্তা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়।
বাছাই কমিটি: নিয়োগ প্রক্রিয়াটি হবে অত্যন্ত স্বচ্ছ। এমডি ও ডিএমডি নিয়োগের জন্য অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টার নেতৃত্বে ৮ সদস্যের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি কাজ করবে। অন্যদিকে, জিএম পদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের আলাদা কমিটি গঠন করা হবে। মোট সাত ধাপে যাচাই-বাছাই ও ইন্টারভিউ শেষে পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হবে।
এই নতুন নীতিমালার মাধ্যমে আশা করা হচ্ছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমে পেশাদারিত্ব ও গতি আসবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।




