Tuesday, August 25, 2026

চাকরি ছেড়ে কৃষিতে সাফল্য: মাল্টাবাগান আর কেঁচো সারে স্বপ্ন গড়লেন নাঈম হুদা

বহুল পঠিত

চাকরি, ফ্রিল্যান্সিং আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—এই চেনা গণ্ডি পেরিয়ে কৃষিকেই নিজের স্বপ্নের ঠিকানা বানিয়েছেন দিনাজপুরের তরুণ নাঈম হুদা। আজ তাঁর হাত ধরেই বৈকুণ্ঠপুর গ্রামে গড়ে উঠেছে হলুদ মাল্টায় ভরা বাগান আর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া কেঁচো সারের খামার।

যেখানে অনেকেই কৃষিকে অবহেলার চোখে দেখেন, সেখানে নাঈম দেখিয়েছেন—সঠিক পরিকল্পনা আর পরিশ্রম থাকলে কৃষিই হতে পারে নিশ্চিত সাফল্যের পথ।

শূন্যতা থেকেই শুরু নতুন পথচলা

২০১৬ সালে যন্ত্র প্রকৌশলে স্নাতক শেষ করে নীলফামারী ইপিজেডে চাকরি নেন নাঈম হুদা। পাশাপাশি করতেন ফ্রিল্যান্সিং। তবে সময় আর শ্রমের তুলনায় আয় কম হওয়ায় চাকরি ছেড়ে দেন। ২০২০ সালে করোনায় ফ্রিল্যান্সিংয়েও ভাটা পড়ে।

নাঈম তখন সিদ্ধান্ত নেন,
“এমন কিছু করব, যেটার প্রয়োজন কখনো শেষ হবে না।”
সেই ভাবনা থেকেই তাঁর কৃষিতে আসা।

এক বিঘা জমি, বড় স্বপ্ন

২০২০ সালে বাড়ির পাশে এক বিঘা পৈতৃক জমিতে আম ও লিচুর বাগান দিয়ে শুরু। এরপর ধাপে ধাপে মাল্টা, কমলা, লেবু আর পেঁপে চাষ। কিন্তু কৃষিতে এসে তিনি বুঝলেন, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের খরচ অনেক বেশি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়ির উঠানে মাত্র কয়েকটি রিং আর গামলায় শুরু করেন কেঁচো সার উৎপাদন। নিজের জমিতে ব্যবহার করে ফল পান চোখে পড়ার মতো।

কেঁচো সারই বদলে দেয় গল্প

এক সময় নিজের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সার উৎপাদন হতে থাকে। স্থানীয় কৃষকদের কাছে কেজিপ্রতি ১২–১৫ টাকায় বিক্রি শুরু করেন নাঈম। চাহিদা বাড়তে থাকায় আশপাশের খামার থেকে গোবর সংগ্রহ করে পুরোদমে নামেন উৎপাদনে।

বর্তমানে তাঁর খামারে

  • ৫৫টি বেড
  • ৪০টি রিং
  • ৫০টির বেশি গামলা

ব্যবহার করে প্রতি মাসে ২৫–৩০ টন কেঁচো সার উৎপাদন হচ্ছে। দিনাজপুর ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে এই সার।

মাল্টাবাগানে হলুদ সাফল্য

নাঈমের বাগানে এখন ৭০০টির বেশি মাল্টা গাছ। প্রথমদিকে ফলের রং সবুজ হওয়ায় ভালো দাম পাননি। পরে কৃষি বিভাগের পরামর্শে রুট প্রুনিং পদ্ধতি ব্যবহার করে গাছের পরিচর্যা বদলান।

ফলাফল—
গাছে গাছে ঝুলছে বড় আকারের হলুদ মাল্টা। টক-মিষ্টি স্বাদের এই মাল্টা দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।

এবার নাঈমের আশা, ২৫০ থেকে ২৮০ মণ মাল্টা উৎপাদন হবে।

শুধু কৃষক নন, উদ্যোক্তাও গড়ে তুলছেন

নাঈম হুদা শুধু নিজের সাফল্যেই থেমে থাকেননি। গত কয়েক বছরে তিনি ৫০০-এর বেশি তরুণকে কৃষি উদ্যোক্তা হতে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। অনেককে কেঁচো ও জৈব সার তৈরির কৌশল শিখিয়েছেন।

খামারে বর্তমানে ১৪ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

পরিবারের চোখে বদলে যাওয়া গল্প

এক সময় কৃষিতে নামায় ছেলের ওপর বিরক্ত ছিলেন বাবা ফজলুর রহমান। আজ ছেলের খামার দেখে তাঁর কণ্ঠে গর্ব,
“ওর পরিশ্রমেই আজ এই খামার দাঁড়িয়ে গেছে। এখন বুঝি, কৃষিতেও ভবিষ্যৎ আছে।”

অনুপ্রেরণার নাম নাঈম হুদা

নাঈম হুদার গল্প প্রমাণ করে-
চাকরি না পেলেও জীবন থেমে থাকে না।
সাহস, ধৈর্য আর সঠিক পরিকল্পনা থাকলে কৃষিই হতে পারে স্বপ্ন পূরণের সবচেয়ে শক্ত ভিত।

আরো পড়ুন

চাকরি ছেড়ে ড্রাগনের বিশাল বাগান! সেই বাগানেই কর্মসংস্থান হলো ৬০ জন মানুষের

সারি সারি সবুজ ড্রাগন গাছ। প্রতিটি ডালে ডালে ঝুলে রয়েছে লালচে-গোলাপি পাকা ড্রাগন ফল। কোনো গাছ থেকে শ্রমিকেরা সাবধানে ফল তুলছেন, আর অন্যদিকে চলছে...

তেঁতুলের বীজ ও চুম্বক দিয়ে পানিতে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর: বিশ্ব জয় করল ৩ শিক্ষার্থী

পানীয় জল এবং জলাশয়ে দ্রবীভূত অণুবীক্ষণিক প্লাস্টিক কণা বা 'মাইক্রোপ্লাস্টিক' বর্তমানে বিশ্ব পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এই কঠিন বৈশ্বিক...

নয়াদিল্লি বাংলাদেশ হাইকমিশনে ‘মিনিস্টার প্রেস’ হলেন সাতক্ষীরার কৃতি সন্তান সাইদুর রহমান

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস উইংয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘মিনিস্টার (প্রেস)’ পদে নিয়োগ পেয়েছেন দেশের প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোঃ সাইদুর রহমান। তিনি...
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ