পানীয় জল এবং জলাশয়ে দ্রবীভূত অণুবীক্ষণিক প্লাস্টিক কণা বা ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বর্তমানে বিশ্ব পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এই কঠিন বৈশ্বিক সমস্যার এক অত্যন্ত সহজ, সস্তা ও পরিবেশবান্ধব সমাধান আবিষ্কার করে পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়েছে ভারতের ১৬ বছর বয়সী তিন শিক্ষার্থী—ভিভান চাওচহারিয়া, আরিয়ানা আগারওয়াল এবং অভিয়ানা মেহতা।
তাদের তৈরি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিটির নাম দেওয়া হয়েছে “Plas-Stick”। সাধারণ ভেষজ উপাদান এবং বিজ্ঞানের চমৎকার মেলবন্ধনে তৈরি এই উদ্ভাবনটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
কীভাবে কাজ করে এই “Plas-Stick” প্রযুক্তি?
উদ্ভাবক তিন শিক্ষার্থী প্রতিদিনের রান্নাবান্নায় ব্যবহৃত তেঁতুলের বীজকে তাদের গবেষণার মূল ভিত্তি হিসেবে বেছে নিয়েছে।
- বিশেষ পাউডার তৈরি: তারা তেঁতুলের বীজের গুঁড়ার সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ সূক্ষ্ম চৌম্বকীয় উপাদান (Magnetic Particles) মিশ্রিত করে এক বিশেষ ধরনের পাউডার তৈরি করে।
- মাইক্রোপ্লাস্টিক একত্রীকরণ: যখন এই পাউডারটি দূষিত বা মাইক্রোপ্লাস্টিকযুক্ত পানিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়, তখন তেঁতুলের বীজের প্রাকৃতিক উপাদানের গুণাগুণে পানিতে ভেসে থাকা ক্ষতিকর প্লাস্টিক কণাগুলো জমাট বেঁধে বা একত্রিত হয়ে ছোট ছোট গুচ্ছ তৈরি করে।
- চুম্বক দিয়ে অপসারণ: প্লাস্টিক কণাগুলোর সাথে চৌম্বকীয় উপাদান যুক্ত থাকায়, পরবর্তীতে একটি সাধারণ চুম্বক ব্যবহার করেই ওই জমে থাকা প্লাস্টিক কণাগুলোকে পানি থেকে টেনে সহজে আলাদা করে ফেলা যায়।
এর ফলে কোনো জটিল বা ব্যয়বহুল ফিল্টার ছাড়াই পানি থেকে প্রায় শতভাগ অদৃশ্য প্লাস্টিক কণা ছেঁকে ফেলা সম্ভব হচ্ছে।
আইআইটি গুয়াহাটির ল্যাবে সফল পরীক্ষা
প্রকল্পটি সাধারণ কোনো ধারণা বা ধারণাপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রযুক্তিটির বাস্তব কার্যকারিতা এবং বৈজ্ঞানিক নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে তারা ভারতের অন্যতম শীর্ষ গবেষণাগার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (IIT) গুয়াহাটি-র জ্যেষ্ঠ গবেষক ও বিজ্ঞানীদের সহায়তা নেয়।
আইআইটি গুয়াহাটির গবেষণাগারে বেশ কয়েক ধাপে পরীক্ষামূলক যাচাই (Experimental Verification) চালিয়ে দেখা যায় যে, প্রযুক্তিটি বাস্তবেও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পানি থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পৃথক করতে সক্ষম।
দ্য আর্থ প্রাইজ ২০২৬-এ বিশ্বসেরার স্বীকৃতি
শিক্ষার্থীদের এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনটি বৈশ্বিক পরিবেশবিষয়ক মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা “The Earth Prize 2026”-এ জমা দেওয়া হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো পরিবেশবান্ধব প্রজেক্টের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে এটি প্রথমে ‘এশিয়া মহাদেশীয় বিজয়ীর’ সম্মান অর্জন করে।
পরবর্তীতে এর সহজ প্রয়োগ, কম খরচ এবং বাস্তবমুখিতা বিবেচনা করে বিচারকমণ্ডলী এটিকে ‘দ্য আর্থ প্রাইজ ২০২৬’-এর চূড়ান্ত বৈশ্বিক বিজয়ী (Global Winner) হিসেবে ঘোষণা করে। ১৬ বছর বয়সেই এই বিশ্বমঞ্চে এমন সাফল্য অর্জন তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।
প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য আশার আলো
সাধারণত আধুনিক মেকানিক্যাল পানি শোধন ব্যবস্থা বা ওয়াটার পিউরিফায়ার স্থাপন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও বিদ্যুৎনির্ভর। ফলে অনগ্রসর বা গ্রামীণ এলাকার মানুষ প্রায়শই প্লাস্টিক দূষিত পানি পান করতে বাধ্য হন।
“Plas-Stick” প্রযুক্তিটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি অত্যন্ত স্বল্প খরচের ও ব্যবহারবান্ধব। উন্নত পানি পরিশোধনাগার নেই কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহ সীমিত—এমন অবহেলিত অঞ্চলে বিষমুক্ত ও নিরাপদ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির বহুল ব্যবহার এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে পারে।
ভিভান, আরিয়ানা ও অভিয়ানার তৈরি এই “Plas-Stick” প্রমাণ করে দিয়েছে যে বড় সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের জন্য সবসময় জটিল যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না; বরং প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধনে তৈরি সাধারণ চিন্তাই বিশ্বকে বদলে দিতে পারে।




