বাংলাদেশের ইতিহাস, ক্রীড়াঙ্গন ও রাজনীতির পাতায় এমন কিছু অনন্য ব্যক্তিত্বের নাম খোদাই করা রয়েছে, যাদের জীবনের পথচলা সাধারণ যেকোনো হিসাব-নিকাশকে হার মানায়। এমনই এক বর্ণিল ও অবিশ্বাস্য জীবনকাহিনীর নায়ক মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)।
রণাঙ্গনে বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেওয়া সৈনিক থেকে শুরু করে সবুজ মাঠের ক্ষিপ্রগতির অ্যাথলেট, আর পরবর্তীতে দেশের রাজনীতি ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলানো প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি অনন্য উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে গেছেন। একই সাথে সামরিক বীরত্ব, ক্রীড়াজগতের বিশ্বসেরা প্রশাসনিক পদ এবং দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মর্যাদা অর্জন করা এক জীবনে সত্যিই বিরল।
আজকে আমরা আলোচনা করব কীভাবে মাঠের দ্রুততম মানব ও অধিনায়ক থেকে শুরু করে তিনি দেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হয়ে উঠলেন এবং তাঁর জীবনের অনন্য ১৭টি অসামান্য অর্জনের কথা।
১. রণাঙ্গনে বীরত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের সোনালী ইতিহাস
- বীর বিক্রম খেতাব অর্জন: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের জীবন বাজি রেখে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ লড়াই করার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাবগুলোর অন্যতম ‘বীর বিক্রম’-এ ভূষিত করে।
- যশোর সেনানিবাসে ঐতিহাসিক বিদ্রোহ: ১৯৭১ সালের মার্চে মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে যশোর সেনানিবাসে সামরিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে বাঙালি সেনাদের সংগঠিত করা ও বিদ্রোহের অন্যতম মূল নেতৃত্ব দেন তিনি। পরবর্তীতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মুখযুদ্ধে সরাসরি অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করে শত্রুমুক্ত করেন দেশের মাটি।
২. রাজনীতির শীর্ষপদ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
- বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি: দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম শীর্ষ চূড়া হিসেবে তিনি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার পরম গৌরব অর্জন করেন।
- জাতীয় সংসদের স্পিকার: দেশের উচ্চ সংসদীয় রীতি রক্ষায় তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সংসদ পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
- স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য: বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির নীতি-নির্ধারণী সর্বোচ্চ ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’-র দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী ও জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে তিনি রাজনীতিতে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করছেন।
- সাতবারের নির্বাচিত এমপি: তিনি নিজ এলাকা থেকে জনগণের বিপুল ভালোবাসায় মোট ৭ বার জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য, নানাবিধ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও নির্বাচন বর্জন না থাকলে এই সংখ্যাটি অন্তত ১০ বার হতে পারত।
- একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের প্রধান: প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়ে তিনি বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রী এবং পরবর্তীতে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
৩. ক্রীড়াঙ্গনে অবিশ্বাস্য বিশ্ব রেকর্ড ও মর্যাদা
রাজনীতিবিদ কিংবা বীর সৈনিক পরিচয়ের বাইরেও স্পোর্টস ওয়ার্ল্ডে তাঁর অবদান বিশ্বমানের:
- পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক (১৯৭০): অবিভক্ত পাকিস্তানের পুরো জাতীয় ফুটবল দলের ইতিহাসে একমাত্র বাঙালি অধিনায়ক হিসেবে ১৯৭০ সালে দায়িত্ব পালন করে ক্রীড়া ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেন।
- বাফুফে (BFF) সভাপতি: বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) শীর্ষ পদে বসে সফলভাবে টানা দুই মেয়াদে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশের ফুটবলে গতি আনেন।
- এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (AFC) সহ-সভাপতি: কেবল দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) মতো সম্মানজনক সংস্থার সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়ে লাল-সবুজের পতাকাকে উঁচুতে তুলে ধরেন।
- ফিফা (FIFA) কমিটিতে বিশেষ পদ: বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ফিফা’-র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘আপিল ও ডিসিপ্লিনারি কমিটি’র সম্মানিত সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ফুটবলের বিচারকাজে দায়িত্ব পালন করেন।
- পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব (১৯৬৪–১৯৬৬): সামরিক ও রাজনৈতিক জীবনের অনেক আগেই ট্র্যাকে নিজের ঝড় তুলেছিলেন তিনি। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব (Fastest Man) হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
- স্প্রিন্টে জোড়া স্বর্ণপদক: অ্যাথলেটিক্সে তাঁর ক্ষিপ্রতার প্রমাণ রেখে জাতীয় পর্যায়ে ১০০ মিটার ও ২০০ মিটার স্প্রিন্ট উভয় বিভাগেই স্বর্ণপদক জয় করেন।
- জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার (১৯৮০): বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে দীর্ঘকাল অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮০ সালে তাঁকে দেশের সম্মানজনক ‘জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়।
- ফিফা অর্ডার অব মেরিট (২০০৪): বিশ্ব ফুটবলে সামগ্রিক বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে ফুটবলের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সম্মাননা ‘FIFA Order of Merit’ লাভ করেন তিনি।
৪. উচ্চশিক্ষা ও প্রজ্ঞাবান সাহিত্যিক পরিচয়
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা: পেশাদার খেলাধুলা ও কঠিন সামরিক প্রশিক্ষণের ফাঁকেও তিনি পড়াশোনায় মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে সফলতার সাথে সম্মান (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।
- জনপ্রিয় কালজয়ী গ্রন্থ রচয়িতা: বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এক একজন সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে একাধিক ঐতিহাসিক বই লিখেছেন তিনি। তাঁর রচিত বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে— ‘রক্তে ভেজা একাত্তর’, ‘গণতন্ত্র রিমান্ডে’, ‘সৈনিক জীবন’ এবং ‘গৌরবাঙ্গনে’।
একদিকে যুদ্ধক্ষেত্রের বুলেটের গর্জন, অন্যদিকে ফুটবলের সবুজ মাঠ; একদিকে জাতীয় সংসদ পরিচালনার দক্ষতা, তো অন্যদিকে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী সভার টেবিল মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) প্রতিটি অঙ্গনেই গড়েছেন সাফল্যের একেকটি মাইলফলক। সততা, দেশপ্রেম ও বহুমুখী প্রতিভার এই মেলবন্ধন কেবল এক মহাকাব্যিক জীবনেরই গল্প বলে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যায় অসীম অনুপ্রেরণা।




