ইসলাম কেবল একটি অনুশীলনের নাম নয়; এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পুরো মানবজাতির জন্য প্রেরিত এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনে ইবাদত, ইমান ও আখলাকের চর্চার পাশাপাশি ইসলামের প্রারম্ভিক ইতিহাস ও আকাইদ সম্পর্কিত সঠিক জ্ঞান থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন।
কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোতে সত্য তথ্যগুলো জানা থাকলে শুধু যে আমাদের ইমান বৃদ্ধি পায় তা নয়, বরং সমাজের নানা বিভ্রান্তি থেকেও নিজেদের মুক্ত রাখা সম্ভব হয়। আজকে আমরা ইসলামের ইতিহাস ও নবুয়তের ধারাক্রম নিয়ে এমন ৫টি মৌলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করব, যা প্রতিটা মুসলিমের জেনে রাখা উচিত।
১. পৃথিবীর সর্বপ্রথম মৃত্যুবরণকারী মানুষ: হাবিল (আ.)
মানব ইতিহাসের প্রথম মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছিল এক ট্র্যাজিক সত্যের মধ্য দিয়ে। পৃথিবীর প্রথম মানব ও প্রথম নবী হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র ছিলেন হাবিল ও কাবিল।
তাদের দুজনের কোরবানি ও তা কবুল হওয়াকে কেন্দ্র করে একটি দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। সেখান থেকেই পৃথিবীতে ঘটে প্রথম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। এই মর্মান্তিক ঘটনায় হজরত হাবিল (আ.) মৃত্যুবরণ করেন। ফলে তিনি-ই হন এই ধরণীর বুকে প্রথম মৃত্যুবরণকারী মানুষ।
২. পৃথিবীর সর্বপ্রথম হত্যাকারী: কাবিল
হিংসা, হিংস্রতা ও অহংকার মানুষকে কতটা অন্ধ করে দিতে পারে, তার জলন্ত উদাহরণ কাবিল। সে তার নিজের ভাই হাবিল (আ.)-এর ওপর ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে হত্যা করে।
ইসলাম আমাদের শেখায় অন্যের ভালো দেখে হিংসা করা অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ, যা মানুষকে বড় পাপের দিকে ঠেলে দেয়।
কুরআনের প্রমাণ
আল্লাহ তাআলা সুরা আল-মায়িদাহ-এর ২৭–৩০ নম্বর আয়াতে এই ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন:
‘তাদের কাছে আদমের দুই পুত্রের সত্য ঘটনা পাঠ করে শোনাও… অতঃপর তার মন তাকে আপন ভাইকে হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করল। ফলে সে তাকে হত্যা করল এবং সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।’
হাদিসের প্রমাণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে যত হত্যাকাণ্ড ঘটবে, তার পাপের একটি অংশ কাবিলের ওপর যাবে। কারণ সে-ই প্রথম এই জঘন্য অপরাধের সূচনা করেছিল (সহিহ বুখারি: ৩৩৩৫, সহিহ মুসলিম: ১৬৭৭)।
৩. মানবজাতির প্রথম নবী: হজরত আদম (আ.)
আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোতে রাখার জন্য যুগে যুগে অনেক নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। এই ধারাক্রমের সূচনা হয়েছিল হজরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমেই।
আল্লাহ তাআলা প্রথমে আদম (আ.)-কে মাটি দিয়ে অত্যন্ত সুন্দর আকৃতিতে সৃষ্টি করেন এবং তাকে মানবজাতির প্রথম নবী হিসেবে মনোনীত করেন। তার মাধ্যমেই পৃথিবীতে এক আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের যাত্রা শুরু হয়।
কুরআনের দলিল
সুরা আল-ইমরানের ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন:
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহিমের বংশধর এবং ইমরানের পরিবারকে সমগ্র বিশ্বের ওপর মনোনীত করেছেন।’
৪. পৃথিবীবাসীর প্রতি প্রেরিত প্রথম রাসুল: হজরত নূহ (আ.)
এখানে একটি বিষয় খুব সুন্দরভাবে বুঝে নেওয়া দরকার নবী ও রাসুলের মধ্যে পার্থক্য।
হজরত আদম (আ.) ছিলেন প্রথম নবী। কিন্তু আদম (আ.)-এর অনেক বছর পর যখন পৃথিবীতে মানুষ এক আল্লাহকে ভুলে মূর্তি পূজা ও শিরক শুরু করে, তখন আল্লাহ মানুষকে পথ দেখানোর জন্য হজরত নূহ (আ.)-কে পাঠান। তাই তিনি হলেন মানবজাতির কাছে প্রেরিত প্রথম রাসুল।
হাদিসের প্রমাণ
কেয়ামতের মাঠে মানুষ যখন শাফায়াতের জন্য বিভিন্ন নবীদের কাছে যাবে, তখন নূহ (আ.)-কে উদ্দেশ্য করে বলা হবে:
‘আপনি (নূহ) পৃথিবীবাসীর প্রতি প্রেরিত প্রথম রাসূল।’ (সহিহ বুখারি: ৪৪৭৬, সহিহ মুসলিম: ১৯৪)।
৫. সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল: হজরত মুহাম্মাদ (সা.)
নবুয়ত ও রিসালতের যে মহান ধারা হজরত আদম (আ.) ও নূহ (আ.)-কে দিয়ে শুরু হয়েছিল, তা পূর্ণতা পেয়েছে আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাধ্যমে। তিনি হলেন ‘খাতামুন্নাবিয়্যীন’ বা শেষ নবী।
তার পর এই পৃথিবীতে আর কোনো নবী বা রাসুল আসবেন না। তার আনীত ধর্ম ও বিধানই কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানবজাতির জন্য একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।
কুরআনের প্রমাণ
সুরা আল-আহযাব-এর ৪০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছেন:
‘মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং সর্বশেষ নবী।’
হাদিসের প্রমাণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে ঘোষণা করেছেন:
‘আমার পরে আর কোনো নবী নেই।’ (সহিহ বুখারি: ৩৪৫৫, সহিহ মুসলিম: ১৮৪২)।
সঠিক ইসলামিক জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব
ইসলামের এই মৌলিক ইতিহাসগুলো জানা প্রতিটি মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব। মনগড়া কথা বা ভুল তথ্য বিশ্বাস না করে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর ভিত্তিতে নিজের আকিদা ও ইমানকে গড়ে তোলা উচিত।
আমরা যদি এই সঠিক তথ্যগুলো নিজেরা শিখি, আমাদের পরিবারের সন্তান ও ছোটদের শেখাই এবং সমাজ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দিই তবেই একটি সুন্দর ও সচেতন মুসলিম সমাজ গড়ে উঠবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক জ্ঞান অর্জন করার এবং কুরআন-সুন্নাহর ওপর আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।




