বাংলাদেশের ইতিহাসে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। দীর্ঘদিন প্রতীক্ষার পর অবশেষে একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে স্বপ্নের পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে আবার স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একনেক সভায় পদ্মা ব্যারেজের গ্রিন সিগন্যাল
বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হলেও সবার নজর ছিল ১১ নম্বর কার্যতালিকায় থাকা পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের দিকে।
প্রকল্পটির জন্য প্রস্তাবিত মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ সালের মধ্যে।
কেন এই প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য জরুরি?
১৯৭৫ সালে ভারত ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এর ফলে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া এবং ইছামতির মতো নদীগুলো প্রায় শুকিয়ে গেছে। এই পানির অভাব শুধু পরিবেশ নয়, কৃষি ও মানুষের জীবনযাত্রাতেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি ধরে রাখা এবং নিয়ন্ত্রণ করা। এর ফলে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থায় আবার মিঠা পানির প্রবাহ নিশ্চিত হবে।
এই প্রকল্পের বিশাল উপকারিতা
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। এর প্রধান সুফলগুলো হলো:
- লবণাক্ততা হ্রাস: উপকূলীয় জেলাগুলোতে লবণাক্ততা কমে আসবে, যা মাটির উর্বরতা বাড়াবে।
- কৃষি ও মৎস্য উন্নয়ন: সেচ সুবিধা বাড়ার ফলে কৃষিতে বিপ্লব আসবে এবং নদীগুলোতে মাছের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
- পরিবেশ রক্ষা: সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং উপকূলীয় বনভূমি টিকে থাকবে।
- নৌ-চলাচল: মৃতপ্রায় নদীগুলো প্রাণ ফিরে পেলে আবার নৌ-পথে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হবে।
ফারাক্কা ব্যারেজ ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা
সত্তরের দশকে ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকে বাংলাদেশ পানিবণ্টন নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৯৬ সালে হওয়া গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। এমন এক সময়ে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের অনুমোদন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রকল্পটি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে মোট ব্যয় হতে পারে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হবে। আগামী সাত বছর অর্থাৎ ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত এই প্রকল্পের কাজ চলবে। এই দীর্ঘ সময়ে বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন এবং পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরির কাজ শেষ করা হবে।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প শুধু একটি নির্মাণ কাজ নয়, এটি দেশের কোটি কোটি মানুষের অস্তিত্বের লড়াই। গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে এটি হতে পারে চিরস্থায়ী সমাধান। সঠিক সময়ে মানসম্মতভাবে এই প্রকল্প শেষ হলে বাংলাদেশ এক নতুন সবুজ বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাবে।




