Wednesday, October 21, 2026

‘জন্ম মৃত্যু বিয়ে আল্লাহর হাতে’ এই প্রচলিত কথাটি কি সঠিক?

বহুল পঠিত

আমাদের সমাজে একটি কথা প্রবাদতুল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে “জন্ম, মৃত্যু আর বিয়ে সবকিছু আল্লাহর হাতে।” আপাতদৃষ্টিতে এই কথাটিকে তাকদির বা ভাগ্যের ওপর পূর্ণ বিশ্বাসের অংশ বলে মনে হলেও, এটি আসলে ইসলামের তাকদির সম্পর্কিত বিশাল ধারণাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে।

বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি বিস্তারিত কথা বলেছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও জনপ্রিয় ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ। তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী শুধু জন্ম, মৃত্যু বা বিয়ে নয় পৃথিবীর সবকিছুই মহান আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ ও তাকদিরের অধীনে।

শুধু তিনটি বিষয় নয়, সবকিছুই আল্লাহর তাকদিরে নির্ধারিত

প্রচলিত বাক্যটির ভুল ধারণা সংশোধন করে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, অনেকেই মনে করেন আল্লাহ তাআলা কেবল জন্ম, মৃত্যু এবং বিয়ে এই তিনটি বিষয় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেন বা নির্ধারণ করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাকদিরের ধারণা এতটা সংকুচিত নয়।

তিনি উল্লেখ করেন:

  • মানুষের রিজিক, উপার্জন ও জীবনের ভালো-মন্দ সবকিছুই আল্লাহর হাতে।
  • আমরা প্রাত্যহিক জীবনে ছোট বা বড় যা-ই করি না কেন, তা আল্লাহর অসীম জ্ঞানের বাইরে নয়।
  • পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মানুষের ছোট-বড় প্রতিটি কাজ ও বিষয় আগে থেকেই লিপিবদ্ধ রয়েছে।

অতএব, কেবল তিনটি জিনিসকে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে বাকি বিষয়গুলোকে আলাদা ভাবার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।

তাকদির কি মানুষকে বাধ্য করে?

তাকদির সম্পর্কে আমাদের অনেকের মনেই একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, ভাগ্য আমাদের যেভাবে পরিচালিত করছে, আমরা সেভাবেই চলতে বাধ্য হচ্ছি।

এই বিষয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহর ব্যাখ্যা হলো:

  • তাকদির মানুষকে কোনো কিছু করতে বাধ্য করে না।
  • আমরা ভবিষ্যতে কী করব, কোন পথ বেছে নেব এবং আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য কী হবে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম জ্ঞান দিয়ে আগে থেকেই জানেন এবং তা লিখে রেখেছেন।
  • মানুষের নিজস্ব ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতাই এখানে কাজ করে, তবে সেই কর্মের ফলাফল আল্লাহর জ্ঞানের আওতাভুক্ত।

তাকদির বনাম মানুষের কর্ম: নবিজির (সা.) নির্দেশনা

ইসলামে ভাগ্য ও মানুষের নিজস্ব চেষ্টার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রয়েছে। তাকদিরের ওপর ভরসা করে অলস বসে থাকার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) হাদিসে উম্মতকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন “তোমরা কাজ করে যাও।” অর্থাৎ, ভাগ্য বা তাকদিরে কী লেখা আছে তা ভেবে বসে না থেকে মানুষকে তার নিজস্ব চেষ্টা ও পরিশ্রম চালিয়ে যেতে হবে।

শায়খ আহমাদুল্লাহ জোর দিয়ে বলেন:

“তাকদির মূলত বিশ্বাসের বিষয়, কর্মের বিষয় নয়।”

মানুষের দায়িত্ব হলো সঠিক নিয়তে পরিশ্রম করা। বাকি ফল আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী নির্ধারিত হবে এবং মানুষ যে পথের দিকে যাবে, তার জন্য সেটাই সহজ করে দেওয়া হবে।

প্রচলিত ধারণা সংশোধনের আহ্বান

সামাজিক এই প্রচলিত ধারণাটি আমাদের বদলে ফেলা উচিত। “জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে আল্লাহর হাতে” এ কথা বলে তাকদিরকে তিনটি নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যে আটকে না রেখে, জীবনের প্রতিটি ধাপে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা ও বিশ্বাস করাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের ভালো-মন্দ, রিজিক, সাফল্য ও সিদ্ধান্তসহ সব কিছুই আল্লাহর তাকদিরের অধীন। তাই ভাগ্যের ওপর অহেতুক বাহানা না বানিয়ে, আমাদের মূল মনোযোগ দেওয়া উচিত সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করার দিকে।

আরো পড়ুন

ইসলামে ভালো বন্ধু নির্বাচন: জীবন ও পরকাল গড়ার সঠিক দিকনির্দেশনা

মানুষ সামাজিক জীব। একা একা জীবনযাপন করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। জীবনের নানা চড়াই-উতরাইয়ে প্রতিটি মানুষেরই একজন ভালো বন্ধুর প্রয়োজন হয়। বন্ধু হলো মানুষের জীবনের...

প্রতিদিনের যে ৮ নফল নামাজে বরকতময় হয়ে ওঠে মুমিনের জীবন

ইসলামে ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো ফরজ বিধানসমূহ। তবে নফল ইবাদত হলো বান্দার আমলনামাকে সুশোভিত করার এবং আল্লাহ তাআলার বিশেষ নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। ফরজ...

যে ৫ ক্ষেত্রে মানুষের দোষ গোপন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: জেনে নিন শরিয়তের নির্দেশ

ইসলাম মানুষকে একে অপরের দোষত্রুটি গোপন রাখতে এবং অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে অত্যন্ত উৎসাহিত করে। তবে এই শিক্ষার পরিধি কেবল মানুষের ব্যক্তিগত...
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ