শুক্রবার, জানুয়ারি ৯, ২০২৬

অদম্য সংগ্রাম, অম্লান আদর্শ: গণমানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ইতিহাস গড়া এক বিপ্লবীর গল্প

বহুল পঠিত

ইতিহাসে কিছু নাম চিরকালই অমর হয়ে থাকে। যারা দেশের জন্য, ন্যায়ের জন্য, ইনসাফের জন্য, মানবতার জন্য আজীবন লড়াই-সংগ্রাম করেন। অত্যাচারী শাসক এবং মাতৃভুমি গ্রাসকারী একদল হায়েনার বিরুদ্ধে একাই গড়ে তুলেন অদম্য প্রতিরোধ। বাংলার ইতিহাসেও তেমনি ১৯৯৩ সালের ৩০ জুন ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শরিফ ওসমান বিন হাদি নামের এক অকুতোভয় বিপ্লবী।

পিতার নাম হাদি হলেও, সেই নামই তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের পরিচয় – ৫৬,৯৭৭ বর্গ মাইলের এই ছোট ভূখণ্ডের প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি হৃদয় স্পর্শ করা সেই নাম উড়ে বেড়ায় বাতাসের পথে, ছড়িয়ে গেছে সমগ্র বিশ্বমঞ্চে, দিগন্ত থেকে দিগন্তে। সামান্য জীবনের প্রতিটি অধ্যায়কে দেশের জন্য উৎসর্গ করেছেন এই অদম্য যোদ্ধা! জুলাই, গণঅভ্যুত্থানের শিখরে দাঁড়িয়ে, দেশের মানুষের জন্য লড়াই করেছেন অনির্দম্য সাহসে। বুলেটের সামনে দাড়িয়ে মুহূর্তে নিজের নাম লিখেছিলেন সকলের হৃদয়ে, এক চিরন্তন বিপ্লবের চিহ্ন হয়ে!

হাদির জীবন ছিল সংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষা, হৃদয়ে ধারণকৃত শহীদ জিয়ার আদর্শের সেই সংগ্রামে ছিলনা কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ। সামাজিক ন্যায়বিচার, ইনসাফ আর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অদম্য কণ্ঠস্বর- শরিফ উসমান হাদি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটকে দীর্ঘ স্থায়ী করতে গড়ে তুলেছিলেন ইনকিলাব মঞ্চ। কালচারাল ফেসিজম ও বিদেশি সংস্কৃতি মোকাবেলায় তৈরি করেছিলেন ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার।

বাংলার মাটিতে বিদ্রোহের সুর: নজরুলীয় চেতনার প্রভাব

কাজী নজরুল তার কলম দিয়ে যেভাবে বিদ্রোহ, অসীম সাহস এবং দেশপ্রেমের চেতনা উজ্জীবিত করেছেন, সেই তেজ শ্বাসের মতো ঝড়ের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। হাদিও সেই সাহিত্যিক বিপ্লবী চেতনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেকে জীবন্ত বিপ্লবের অংশ করে তোলেন। বাংলার মাটি সেই হাজারো বিদ্রোহীর রক্তে শুদ্ধ হয়ে উঠে। হাদির জীবন, তার সাহস, তার ন্যায়পথের প্রতি অটল বিশ্বাস- সবকিছুই সেই নজরুলীয় বিদ্রোহী চেতনারই বাস্তব প্রতিফলন।

বাংলার প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি তরুণের মনে আজও বাজে সেই ঝঞ্ঝার সুর। হাদির অকল্পনীয় সাহস, নজরুলের কলম- মিলে তৈরি হয় যেন এক অবিচল বিপ্লব। হাদির বিপ্লবে ছুঁয়ে যায় সকল হৃদয়, ছুঁয়ে যায় প্রজন্ম।

বল বীর – আমি চির-উন্নত শির!

আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্নি!
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠুমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি,
ফিং দিয়া দিই তিন দোল্!
আমি চপলা-চপল হিন্দোল!
আমি তাই করি ভাই, যখন চাহে এ মন যা’,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,
আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!
আমি মহামারী, আমি ভীতি এ ধরিত্রীর।
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার, আমি উষ্ণ চির-অধীর।
বল বীর –
আমি চির-উন্নত শির!

কাজী নজরুল ইসলাম এই কবিতা বোধ হয় হাদির জন্যই লিখে ছিলেন। নজরুল কলম দিয়ে বিদ্রোহ করেছিলেন, আর হাদি তার লেখায় অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেই হয়ে উঠেছিলেন জীবন্ত বিপ্লব। বাংলার মাটি তাই তো দুজন বিদ্রোহীকে (একজন শব্দে, আর একজন রক্তে) পাশাপাশি নিয়ে তার হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছে।

তার কণ্ঠে ছিল “দীর্ঘ জীবন নয়, ইতিহাস গড়াই সাফল্য”

শহীদ ওসমান হাদি বলেছিলেন-

"ধরুন আমি আগামী ৫০ বছর বাঁচলাম, কিন্তু আমার জীবন দিয়ে কোনো impact তৈরি হলো না- দেশের জন্য না, রাষ্ট্রের জন্য না, উম্মাহর জন্য না, কিংবা জাতির জন্যও না। কিন্তু ধরুন আমি মাত্র ৫ বছর বাঁচলাম। যদি সেই ৫ বছরের মধ্য দিয়ে এমন একটি প্রভাব তৈরি হয় যা আগামী ৫০ বছর টিকে থাকে। তাহলে অনেক দিন বেঁচে থাকাই কি সাফল্যের ? বলেন?

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কত দিন বেঁচে ছিলেন? কিন্তু ভেবে দেখুন- আজ পর্যন্ত তিনি আমার অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন।"

গুলির ভয় নেই, আছে শুধু ন্যায়ের দাবি

শহীদ হাদি বলেছিলেন-

"আমাদেরকে গুলি করার আগ পর্যন্ত কোনো কিছুই আমাদের গায়ে লাগে না। যতক্ষণ না পর্যন্ত বুকে বা মাথায় গুলি চলবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কোনো কিছুকে সংগ্রাম (struggle) মনে করি না। এবং আমাদের বাড়তি কোনো নিরাপত্তার (security) প্রয়োজন নেই। শুধু আমাদেরকে যদি কেউ গুলি করে মেরে ফেলে, তাকে যেন ধরে বিচার করা হয়। 

আপনি যদি আজকে আমাকে, জাবেরকে বা আমাদের টিমকে মেরে ফেলেন এবং তার যদি বিচার করতে না পারেন, তাহলে নতুন কেউ আর জন্মাবে না। শুধু এই জন্যই তার বিচার করে ফেলতে হবে- আর কিছু না। আমাদের কোনো বিশেষ নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই।"

হাদি কখনো ভয়ের কাছে নত হয়নি। প্রতিটি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তার সাহস ও দৃঢ়তা চমকপ্রদ ছিল। ঢাকা-৮ আসনের জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে জনগণের সমর্থন ও ভালোবাসা অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সৎ ও দৃঢ় নেতৃত্ব সবসময় মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে পারে।

যার ছিল শহীদ হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা

তিনি বলেছিলেন-

আমি তো ভীষণ ভাবে প্রত্যাশা করি-
একটা তুমুল মিছিল হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সেই মিছিলের সামনে আমি আছি।
কোন একটা বুলেট এসে আমার বুকটা হয়তো বিদ্ধ করে দিয়েছে,
এবং সেই মিছিলে আমি হাসতে হাসতে আমি শহীদ হয়ে গেছি।

প্রজন্মের পথে হাদির আলো: অবদান ও সংগ্রাম

১. জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা

শহীদ ওসমান হাদি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারিতে ছিলেন। তিনি ছিলেন সেই অদম্য মনোবল যেটি জনসাধারণকে একত্রিত করতে সক্ষম। প্রতিটি আন্দোলনের মুহূর্তে তার সাহস ও নেতৃত্ব ছিল তরুণ প্রজন্মের জন্য প্রেরণার আলো। গণঅভ্যুত্থানের এই কঠিন সময়েও হাদি ছিলেন ভয়কে পরাজিত করে মানুষের স্বপ্ন ও আশা বাঁচিয়ে রাখার প্রতীক।

ইনকিলাব মঞ্চ প্রতিষ্ঠা

হাদি শুধু আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী ছিলেন না; জুলাইকে টিকিয়ে রাখতে তিনি গড়ে ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চ। হয়ে ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, দেশের মানুষের কণ্ঠস্বর। তার স্পষ্ট, শক্তিশালী এবং সত্যনিষ্ঠ বক্তব্য রাজনৈতিক আন্দোলনের পেছনে জনতার আস্থা সৃষ্টি করেছিল। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে একজন দেশপ্রেমিক জনগণের ভাবনা, আশা ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করতে পারেন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কিভাবে একাই ২০ কোটি মানুষের বিপ্লবী কণ্ঠস্বর রুখে দাড়াতে পারেন।

২. বিপ্লবী চেতনার ধ্বনি

হাদি শুধুই একজন বিপ্লবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন জীবন্ত বিপ্লবের প্রতীক। তার সাহসিকতা, অনন্য ধৈর্য ও দেশের জন্য নিঃস্বার্থ নিষ্ঠা যেন একটি কবিতার মতো ধ্বনিত হয়- প্রজন্মকে জাগ্রত করে, সমাজে ন্যায়ের আলো ছড়িয়ে দেয়।

৩. ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা

শহীদ ওসমান হাদি কালচারাল ফ্যাসিজম মোকাবেলায় তৈরি করেন ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার (Inqilab Cultural Center)। এটি একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র যা ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর সাথে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিজম’ মোকাবিলা, সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার, যুব সমাজকে জ্ঞানের দিকে আকৃষ্ট করতে ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য তিনি এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেন্টারটির মূল কাজ ছিল সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা, যার মধ্যে বই বিতরণ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজও অন্তর্ভুক্ত ছিল, হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর এর দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। 

৪. বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ভ্যানগার্ড

শহীদ হাদি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষক। দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ছিলেন সর্বদা সোচ্চার। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি তার অবস্থান প্রকাশ করেছিলেন স্পষ্ট ও সাহসী কণ্ঠে। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে একজন নেতা দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় লড়াই করতে পারে, আর দেশের মানুষকে একত্রিত করতে পারে। তার এই দৃঢ় মনোবল দেশের মানুষের জন্য সাহস ও নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে আছে।

তিনি সবসময় শহীদ জিয়ার মত দেশের গর্ব ও স্বাধীনতার মান বজায় রাখতে সংগ্রাম করেছেন। বিদেশি আধিপত্য, অনৈতিক প্রভাব বা অন্যায়ের কাছে কখনো নত হননি।

৫. শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথপ্রদর্শক

শহীদ হাদি সর্বদা বিশ্বাস করতেন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের শক্তিতে। তিনি কোনো সহিংসতার আশ্রয় নেননি। তার নেতৃত্বে আন্দোলন ছিল সংহত, ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা সম্ভব এবং তা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

৬. দেশপ্রেম ও ন্যায়ের জন্য নিঃস্বার্থ লড়াই

হাদি কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য লড়েননি। তার জীবন ছিল দেশপ্রেম ন্যায়ের জন্য নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের প্রতীক। দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এই নিঃস্বার্থতা আজো তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।

৭. সারা দেশের মানুষের ভালোবাসা অর্জন

সারা দেশের মানুষের ভালোবাসা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এই ভালোবাসা জন্ম নেয় নিঃস্বার্থ ত্যাগে, স্পষ্ট অবস্থানে আর সত্যের পথে অবিচল থাকার মধ্য দিয়ে। শরিফ ওসমান হাদি সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন- ভালোবাসা অর্জন করতে হলে আগে মানুষের হয়ে দাঁড়াতে হয়।

তিনি মানুষের কাছে কিছু চাননি, বরং মানুষের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তার কণ্ঠে ছিল না ব্যক্তিগত স্বার্থের ভাষা; ছিল দেশের কথা, মানুষের মুক্তির কথা, সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন। তাই গ্রামের প্রান্ত থেকে শহরের রাজপথ- সবখানেই মানুষ তাকে নিজের মানুষ মনে করেছে। এই ভালোবাসা ছিল বিশ্বাসের, ছিল আস্থার, ছিল একজন নির্ভীক সন্তানের প্রতি জাতির সম্মিলিত মমতা।

মানুষ তাকে ভালোবেসেছে, কারণ সে মানুষের ভাষায় কথা বলেছে। ভালোবেসেছে, কারণ সে মৃত্যুর ভয়কে তুচ্ছ করে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ভালোবেসেছে, কারণ সে নিজের নিরাপত্তা নয়, বিচার আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। এই ভালোবাসা ছিল অর্জিত- রক্তে, ঘামে আর আদর্শে গড়া।

৮. প্রজন্মের প্রেরণার উৎস: হাজারো তরুণের উদ্দীপনা

হাদির নেতৃত্বে হাজারো তরুণ রাজনৈতিক সচেতনতা ও দেশের জন্য দায়বদ্ধতার পাঠ শিখেছে। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে একজন নেতা নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন ও আন্দোলনের প্রতি উৎসাহ দিতে পারেন। তার উদাহরণ ভবিষ্যতের নায়ক তৈরি করবে। তার অসাপ্তকাজ তার সপ্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম করবে।

আজ তিনি শারীরিকভাবে হয়ত নেই, কিন্তু সারা দেশের মানুষের ভালোবাসার ভেতরেই তিনি সবচেয়ে বেশি জীবিত। এই ভালোবাসাই প্রমাণ করে- শরিফ ওসমান হাদি কেবল একজন মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি আদর্শ, একটি আন্দোলন, একটি চেতনার নাম। আর সেই চেতনা যুগ থেকে যুগান্তরে নতুন হাদি জন্ম দেবে, যারা বাঙালির মুক্তির জন্য আবার দাঁড়াবে।

৯ . সংগ্রাম ও ইতিহাসের উজ্জ্বল অধ্যায়:

হাদির প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল দেশের মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়ের জন্য লেখা ইতিহাস। শিক্ষার্থী থেকে জনতা, সবাই তার নেতৃত্বে একত্রিত হয়ে দেশপ্রেম ও বিপ্লবের নক্ষত্র দেখেছিল। তার জীবন যেন এক সাহিত্যের অধ্যায়, যেখানে রক্ত, কলম ও শব্দ মিলে তৈরি হয় অদম্য যোদ্ধার চিত্র।

রক্তে লেখা আজাদির অঙ্গীকার– ” আমি চলে গেলে আমার সন্তান লড়বে

হাদি বলেছিলেন-

‘মৃত্যুর ফয়সালা জমিনে না, আসমানে হয়। আমি চলে গেলে আমার সন্তান লড়বে, তার সন্তান লড়বে। যুগ হতে যুগান্তরে আজাদির সন্তানেরা স্বাধীনতার পতাকা সমন্নত রাখবেই। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।’

হাদির জীবনকথা শিখিয়েছে যে, সত্যিকারের নেতা কখনো নিজেকে বড় করে দেখানোর জন্য নয়, বরং মানুষের কল্যাণ ও দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষায় আত্মনিয়োগ করতে হয়। তিনি কেবল একজন বীর সাহসী কণ্ঠই ছিলেন না; তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক, আদর্শবাদী, এবং গণতান্ত্রিক চেতনার প্রেরণার উৎস

হাদির অসামান্য নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের কারণে তাকে মনে রাখবে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ, যতদিন এই দেশ থাকবে। মৃত্যুর পরও তার আদর্শ ও মূল্যবোধ আমাদের সমাজকে অনুপ্রাণিত করে চলবে।

দেশের প্রতিটি মানুষ এখন হাদি হতে চায়। শ্লোগানে মুখরিত বাংলার রাজপথ। তুমি কে? আমি কে? হাদি হাদি, দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা। লক্ষ লক্ষ তরুণের এই বিপ্লবী ও সাহসী দৃঢ় স্লোগানেই বলে দিচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোনদিকে যাবে।

“আমরা সবাই হাদি হবো”: প্রজন্মের নবজাগরণ

সেদিন সংসদের দক্ষিণ প্লাজা কেঁপে ওঠেছিল লাখো মানুষের পদধ্বনিতে। শহীদ শরিফ ওসমান হাদির জানাজা যেন বিদ্রোহের সুর, শোকের জ্বালা, আর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শিঙা। হাতের পতাকা, মুখের স্লোগান, চোখের অশ্রু- সব মিলিয়ে এক জাগ্রত বিপ্লবের সমাবেশ।

হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক ইমামতিতে নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। রাজনৈতিক নেতা, ছোট্ট বাচ্চা, ছাত্র, জনতা- সবাই একসাথে চিৎকার করে, “আমরা সবাই হাদি হবো! যুগে যুগে লড়ে যাবো!”

পুরানা পল্টনের রাস্তায় দেশদ্রোহীর গুলিতে মাথার আঘাতে আহত হাদি, ঢাকা, এভারকেয়ার, সিঙ্গাপুর- সব পথ পেরিয়ে হয়ে উঠেছিলেন বিপ্লবের জীবন্ত প্রতীক। আজ তার বিদায় শুধু শেষ নয়, এটা জন্ম দেয় আরও শক্তিশালী বিপ্লবের শপথ। দক্ষিণ প্লাজা কেবল জানাজার স্থান নয়- এটা শোক, বিদ্রোহ আর প্রজন্মের চেতনার ঝঞ্ঝার মতো।

শেষ কথা

শহীদ ওসমান হাদি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি জীবনে যতটুকু দিয়েছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি অনুপ্রেরণা রেখে গেছেন দেশের মানুষের হৃদয়ে। তাইতো তার শাহাদাতে কাঁদছে দেশের সর্বস্তরের জনগন। সবার মনে একটাই আশা হাদির মত সৎ, আদর্শবান, দেশ প্রেমিক, আধিপত্য ও আগ্রাসন বিরোধী কণ্ঠ যেন প্রত্যেক ঘরে ঘরে জন্ম নেয়। প্রতিটি কণ্ঠে একটাই স্লোগান- “আমরা সবাই হাদি হবো! যুগে যুগে লড়ে যাবো!”

মোঃ আব্দুর রাহমান আল-আমিন (জিওবাংলা, টিভি)

আরো পড়ুন

স্বাগতম ২০২৬: নতুন স্বপ্ন, নতুন সম্ভাবনা এবং উৎসবের রঙে রঙিন বাংলাদেশ!

ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়ার সাথে সাথেই ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিল ২০২৫, আর আমরা পা রাখলাম ২০২৬ সালে। পুরোনো বছরের সমস্ত গ্লানি, হতাশা আর না পাওয়ার হিসাব চুকিয়ে নতুন উদ্যমে জেগে ওঠার দিন আজ। গুড নিউজ বাংলাদেশ পরিবারের পক্ষ থেকে সারা বিশ্বের সকল বাংলাভাষীকে জানাই ইংরেজি নববর্ষের অনেক অনেক শুভেচ্ছা। হ্যাপি নিউ ইয়ার ২০২৬!

নিপীড়নের মুখেও অটল সাহসে ইতিহাসের পথে: এক নারীর অনমনীয় নেতৃত্ব

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতিহিংসামূলক শাসনের যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, তার সবচেয়ে নির্মম শিকারদের একজন ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে তাঁর বিরুদ্ধে যে ধারাবাহিক নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তা শুধু একজন বিরোধী নেত্রীর ওপর আঘাত ছিল না- এটি ছিল গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়ের ধারণার ওপর সরাসরি আক্রমণ।

জোট রাজনীতিতে নতুন গতি, নির্বাচনী মাঠে স্পষ্ট দুই বলয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন গতি ও দৃশ্যমান মেরুকরণ। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনে এসে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অবস্থান স্পষ্ট করছে- যেখানে জোট, সমঝোতা ও নির্বাচনী কৌশল হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ