বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ৮, ২০২৬

লাখো মানুষের ভালোবাসার ঢেউয়ে, অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধায় বিদায় শহীদ শরিফ উসমান হাদির

বহুল পঠিত

একটি বিদায়ের দিন, একটি ইতিহাসের জন্ম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এমন কিছু দিন আসে, যেগুলো ক্যালেন্ডারের পাতায় শুধু একটি তারিখ হয়ে থাকে না- সেগুলো হয়ে ওঠে জাতির স্মৃতির অংশ। আজ শনিবার, ২০ ডিসেম্বর, ঠিক তেমনই একটি দিন।
এই দিনটি সাক্ষী রইল ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ভ্যানগার্ড শরিফ উসমান হাদি–এর চূড়ান্ত বিদায়ের।

আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি, আমি  পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’। আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ, আমি  আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ! আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল, আমি  চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’ পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’ ফিং দিয়া দিই তিন দোল্! বল বীর- আমি চির-উন্নত শির। ছবিঃ সংগ্রহীত

যে মানুষটি জীবদ্দশায় আপসহীন কণ্ঠে কথা বলেছেন রাষ্ট্র, জনগণ ও ন্যায়ের পক্ষে- তার বিদায়ও হলো লাখো মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর অশ্রুর মধ্য দিয়ে।

সকাল শুরু হয় অপেক্ষা দিয়ে

শনিবারের সকাল ঢাকার আকাশে অন্যরকম ভারী ছিল।
মানিক মিয়া এভিনিউ, সংসদ ভবন এলাকা, খামারবাড়ি, আসাদ গেট- সবখানেই মানুষের ঢল। কেউ এসেছেন ভোরে, কেউ রাত জেগে। কারও হাতে জাতীয় পতাকা, কারও হাতে হাদির ছবি, কারও চোখে শুধু নীরব জল।

সকালে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হিমাঘার থেকে মরদেহ নেওয়া হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। সেখানে সম্পন্ন হয় ময়নাতদন্ত।
এরপর শেষ গোসলের জন্য আবার মরদেহ আনা হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে

এই প্রতিটি ধাপেই মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। হাসপাতালের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যেন কেউ কাউকে চিনত না, তবু সবাই এক সুতোয় বাঁধা- শোক আর শ্রদ্ধায়।

সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে আসা নিথর শরীর

এই বিদায়ের পেছনে আছে এক দীর্ঘ যন্ত্রণার গল্প।

‘হারাম খাইয়া আমি এতো মোটাতাজা হই নাই, যাতে আমার স্পেশাল কফিন লাগবে! খুবই সাধারণ একটা কফিনে হালাল র-ক্তের হাসিমুখে আমি আমার আল্লাহর কাছে হাজির হবো। (ওসমান হাদি)

গত শুক্রবার দুপুরে আততায়ীর গুলিতে গুরুতর আহত হন শরিফ উসমান হাদি
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় পরিবারের সিদ্ধান্তে তাকে স্থানান্তর করা হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে

উন্নত চিকিৎসার আশায় ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে নেওয়া হয় সিঙ্গাপুরে।
সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টায় থেমে যায় তার হৃদস্পন্দন।

পরদিন শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় তার মরদেহ দেশে পৌঁছায়। বিমানবন্দরেই যেন নেমে আসে শোকের নীরবতা। সেখান থেকে মরদেহ নেওয়া হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে।

বাংলাদেশ ফিরে পায় তার একজন সন্তানক- কিন্তু জীবিত নয়।

সংসদ ভবনে শেষ শ্রদ্ধা

দুপুর সোয়া ১টার দিকে মরদেহ পৌঁছে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়
এই দৃশ্য ছিল ইতিহাসের মতো।

খামারবাড়ি থেকে আসাদ গেট পর্যন্ত পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
লাখো মানুষের ভিড় সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়।

১৬টি প্রবেশপথ, চীন থেকে আনা ৮টি আর্চওয়ে গেট, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ- সব মিলিয়ে দৃশ্যটি ছিল এক অভূতপূর্ব জাতীয় শ্রদ্ধাঞ্জলি।

সকাল সাড়ে ১০টায় বহু অপেক্ষার পর সাধারণ মানুষকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
লাইন ধরে, শৃঙ্খলার সঙ্গে মানুষ ঢুকেছে- কারণ তারা জানত, যাকে বিদায় জানাতে এসেছে, তিনি বিশৃঙ্খলার মানুষ ছিলেন না।

জানাজা: নীরবতার ভেতরে কান্না

দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হয় জানাজা।
এই জানাজা ছিল শুধু ধর্মীয় নয়- এটি ছিল একটি জাতির আবেগের বিস্ফোরণ।

জানাজার কাতারে ছিলেন রাজনৈতিক নেতারা, ছাত্রসমাজ, শ্রমজীবী মানুষ, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবক- সবাই।
কেউ কাঁদছিল প্রকাশ্যে, কেউ চুপচাপ চোখ মুছছিল।

একজন তরুণ বললেন-

“হাদির মতো মানুষ হাজার বছরে একবার জন্ম নেয়। তার জন্য সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকাও সৌভাগ্য।”

আরেকজন বললেন-

“আমি চেয়েছিলাম উনি সুস্থ হয়ে ফিরে এসে নির্বাচনে নামবেন। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: নীরব ক্যাম্পাস

শরিফ উসমান হাদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই কারণে ভিড় এড়াতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব প্রবেশপথ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন।
এক বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষকে ক্যাম্পাসে ভিড় না করার অনুরোধ জানানো হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়,

“সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখিত।”

নজরুলের পাশে হাদির সমাহিত হওয়া- এটি শুধু একটি কবরস্থান নয়, এটি একটি প্রতীক।
বিদ্রোহী কবির পাশে শুয়ে পড়লেন এক বিদ্রোহী কণ্ঠ।

মানুষ কেন কাঁদছিল?

শরিফ উসমান হাদি ছিলেন শুধু কোনো সংগঠনের মুখপাত্র নন।
তিনি ছিলেন-

  • আপসহীন
  • ভারতীয় আধিপত্য বিরোধী সোচ্চার কণ্ঠ
  • স্পষ্টভাষী
  • জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো এক সাহসী কণ্ঠ
  • সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নির্ভীক

তিনি কথা বলেছেন যখন অনেকেই চুপ ছিলেন।
তিনি দাঁড়িয়েছেন তখন, যখন দাঁড়ানো ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।

এ কারণেই তার জানাজা পরিণত হয়েছে গণমানুষের জানাজায়

ইতিহাসে স্থান

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যারা ক্ষমতায় না থেকেও ইতিহাস গড়েন।
শরিফ উসমান হাদি ঠিক তেমনই একজন।

তার মৃত্যু প্রশ্ন রেখে যায়-
তার জীবন উত্তর হয়ে থাকে।

শেষ কথা

এই বিদায় কোনো শেষ নয়।
এটি একটি দায়িত্বের শুরু।

শরিফ উসমান হাদি আজ নেই-
কিন্তু তার কণ্ঠ রয়ে গেছে লাখো মানুষের ভেতরে।
তার আদর্শ রয়ে গেছে রাজপথে, সভায়, লেখায়, উচ্চারণে।

জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সেই দিন ইতিহাস লিখেছে-
একজন মানুষ কীভাবে মৃত্যুর পরও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।

আরো পড়ুন

জুলাই বিপ্লবের বীরদের জন্য আসছে ঐতিহাসিক ‘দায়মুক্তি অধ্যাদেশ’!

ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত দ্বিতীয় স্বাধীনতার কারিগরদের জন্য এক বিশাল সুখবর নিয়ে এসেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বীর যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা দিতে সরকার একটি বিশেষ ‘দায়মুক্তি অধ্যাদেশ’ (Indemnity Ordinance) প্রণয়ন করতে যাচ্ছে।

রাজধানীতে ‘জুলাই বীর সম্মাননা’: ১২০০ যোদ্ধা ও সাংবাদিককে বিশেষ স্মারক প্রদান

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা এবং আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হলো বর্ণাঢ্য 'জুলাই বীর সম্মাননা' অনুষ্ঠান। আগ্রাসন বিরোধী আন্দোলনের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং ঐতিহাসিক ফেলানী হত্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবার, আহত যোদ্ধা এবং সাহসী সাংবাদিকদের বিশেষ সম্মাননা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ড. ইউনূসের ডাক: গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান

একটি বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দেশবাসীকে ঐতিহাসিক এক সিদ্ধান্তের অংশ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ ইউনূস। আগামী জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি সম্ভাব্য গণভোটে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার অনুরোধ করেছেন তিনি। ড. ইউনূসের মতে, এটি কেবল একটি ভোট নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাষ্ট্র সংস্কারের এক বড় সুযোগ।
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ