স্ট্রোক সাধারণত হঠাৎ করে ঘটে গেলেও এর ঝুঁকি তৈরি হয় দীর্ঘদিনের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রাত্যহিক জীবনের কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করলে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব।
বর্তমানে কেবল বয়স্ক ব্যক্তিরাই নন, ৫৫ বছরের কম বয়সি তরুণ ও যুবকদের মধ্যেও স্ট্রোকের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে বলে সতর্ক করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাই স্ট্রোক প্রতিরোধে আগে থেকেই সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
১. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা
স্ট্রোকের প্রধান এবং অন্যতম কারণ হলো উচ্চ রক্তচাপ। রক্তচাপ বেশি থাকলে মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা পরবর্তীতে স্ট্রোকের দিকে ঠেলে দেয়।
- করণীয়: নিয়মিত রক্তচাপ মেপে দেখতে হবে। যদি রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে।
২. ধূমপান পুরোপুরি ত্যাগ করা
ধূমপান শরীরের রক্তনালির ব্যাপক ক্ষতি করে। এটি রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয় এবং রক্তের ভেতর ক্ষতিকর জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায়। শুধু নিজে ধূমপান করা নয়, অন্যের ধূমপানের ধোঁয়া (পরোক্ষ ধূমপান) শরীরে প্রবেশ করলেও হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই ধূমপানের অভ্যাস আজই ত্যাগ করুন।
৩. নিয়মিত শরীরচর্চা ও ব্যায়াম
শরীরের রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে এবং হৃদ্যন্ত্রকে সুস্থ রাখতে শারীরিক পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা হালকা ব্যায়াম করা উচিত যাতে শরীরে ঘাম ঝরে।
- প্রতিদিন মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটের হাঁটাই আপনাকে স্ট্রোক থেকে রক্ষা করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
৪. কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা
রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল বা শর্করার (ডায়াবেটিস) উপস্থিতি রক্তনালির দেয়াল শক্ত ও সরু করে ফেলে, ফলে মস্তিষ্কে স্বাভাবিক রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণে না থাকা ডায়াবেটিস স্ট্রোকের অন্যতম বড় কারণ। নিয়মিত রক্তের পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
৫. খাদ্যাভ্যাসে স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনা
আমাদের প্রতিদিনের খাবার তালিকার ওপর নির্ভর করে আমাদের ধমনীর স্বাস্থ্য। প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত তেল-চর্বি ও ফাস্টফুড জাতীয় খাবার রক্তনালির চরম ক্ষতি করে।
কী খাবেন আর কী এড়িয়ে চলবেন?
- খাবেন: প্রচুর পরিমাণে তাজা শাকসবজি, ফলমূল, পূর্ণ শস্য (লাল চালের ভাত, আটা) এবং আঁশযুক্ত খাবার।
- এড়িয়ে চলবেন: অতিরিক্ত কাঁচা লবণ, চর্বিযুক্ত মাংস, ভাজাপোড়া এবং কৃত্রিম মিষ্টান্ন।
৬. পর্যাপ্ত ও পরিমিত ঘুম
সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন নিয়ম মেনে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। অতিরিক্ত কম ঘুম রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, আবার অতিরিক্ত ঘুমানোর অভ্যাসও স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস তৈরি করুন।
স্ট্রোকের আগাম লক্ষণ: কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি হঠাৎ করে নিচের লক্ষণগুলো দেখতে পান, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে:
- অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা বুকে অস্বস্তি বোধ হওয়া।
- হঠাৎ করে মাথা ঘোরা বা শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা।
- শরীরের যেকোনো এক পাশ বা এক হাত-পা অবশ ও দুর্বল হয়ে যাওয়া।
- কথা জড়িয়ে যাওয়া বা স্পষ্টভাবে কথা বলতে না পারা।
- চোখে হঠাৎ ঝাপসা দেখা বা দেখতে সমস্যা হওয়া।
সঠিক সময়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন কেবল স্ট্রোক প্রতিরোধই করে না, বরং মানুষের অমূল্য জীবন বাঁচাতেও সাহায্য করে।




