দেশের বাজারে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম দিন দিন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, ঠিক তখনই মেহনতী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এক বিশাল স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলো সরকার। সারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে চাল চালু করা হয়েছে এক বিশেষ প্রকল্প। সরকারের বড় মাপের এই খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় মাত্র ১৫ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ শুরু হয়েছে।
গত ১ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপে উপকৃত হতে যাচ্ছে দেশের কোটি মানুষ। আপনার এলাকায় কীভাবে এই চাল বিতরণ করা হচ্ছে এবং কারা কারা এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত, তা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো আজকের প্রতিবেদনে।
১ আগস্ট থেকে শুরু খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দেশের মোট ৪৯৫টি উপজেলায় এই কার্যক্রম পুরোদমে চালু করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের নিবন্ধিত ও সুবিধাভোগী ৫৫ লাখ কার্ডধারী পরিবার এই প্রকল্পের সরাসরি সুফল পাবেন।
সাধারণ মানুষ যাতে খাদ্য সংকটে না পড়েন, সে জন্যই বছরের বিশেষ কিছু মাসে এই চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে করে বছরের একটি বড় সময় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে চাল কেনার চিন্তায় ভুগতে হবে না।
প্রতি পরিবার পাচ্ছে ৩০ কেজি চাল: বছরে মোট ৬ মাস সুবিধা
সরকারের এই নতুন নিয়মে প্রতিটি কার্ডধারী পরিবার প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে এই বিতরণ প্রক্রিয়া সারা বছর একভাবে চলবে না। বছরে মোট ৬টি নির্দিষ্ট মাসে এই ১৫ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়া হবে।
যে ছয়টি মাসে এই সুবিধা পাওয়া যাবে:
- আগস্ট
- সেপ্টেম্বর
- অক্টোবর
- নভেম্বর
- মার্চ (পরবর্তী বছর)
- এপ্রিল (পরবর্তী বছর)
যে সময়গুলোতে সাধারণত কাজের সুযোগ কিছুটা কমে যায় বা মানুষের হাতে নগদ টাকার টানাটানি থাকে, ঠিক সেই সময়গুলোকেই সরকার এই চাল বিতরণের জন্য বেছে নিয়েছে।
অপ পুষ্টি দূর করতে ২৪৮টি উপজেলায় দেওয়া হচ্ছে ‘পুষ্টিচাল’
শুধু পেটের ক্ষুধা মেটানোই শেষ কথা নয়, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও শারীরিক বিকাশের কথা ভেবেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে দেশের নারী ও শিশুদের পুষ্টির মান বাড়ানোর ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই লক্ষ্যে দেশের ২৪৮টি উপজেলায় প্রায় ২৫ লাখ ২৯ হাজার উপকারভোগীর হাতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ ‘পুষ্টিচাল’ (Fortified Rice)। এই চালে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান মেশানো থাকে, যা অপুষ্টি দূর করতে দারুণ কার্যকরী। এছাড়া বাকি ২৪৭টি উপজেলার প্রায় ২৯ লাখ ৭১ হাজার পরিবারের মাঝে সাধারণ চাল বিতরণ করা হচ্ছে।
ওএমএস (OMS) কার্যক্রমও চলছে সমানতালে
যারা কার্ডধারী নন কিন্তু কম দামে চাল ও আটা কিনতে চান, তাদের জন্যও খোলা রাখা হয়েছে সাশ্রয়ী বিক্রয় ব্যবস্থা। সারা দেশে মোট ১ হাজার ১০৮টি কেন্দ্র থেকে খোলা বাজারে বিক্রয় বা ওএমএস (OMS) কার্যক্রম নিয়মিত চালু রয়েছে।
এসব দোকান ও ভ্রাম্যমাণ ট্রাক থেকে সাধারণ মানুষ সরাসরি নির্ধারিত ও সাশ্রয়ী মূল্যে আটা ও চাল কিনে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে পারছেন। ফলে সার্বিকভাবে বাজারে খাদ্যপণ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
দেশে খাদ্য মজুত এখন রেকর্ড পরিমাণে
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এত কম মূল্যে বিপুল পরিমাণ চাল দিতে গিয়ে দেশে খাদ্য সংকট তৈরি হবে কিনা? এ বিষয়ে অত্যন্ত আশ্বস্ত করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
বর্তমানে দেশে সরকারি খাদ্য মজুত অত্যন্ত সন্তোষজনক এবং অতীতে যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। একই সাথে দেশের অভ্যন্তর থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা, তাও সফলভাবে এগিয়ে চলছে।
গুদামে মজুতের সর্বশেষ পরিসংখ্যান
সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি গুদামে বর্তমানে মোট খাদ্যশস্যের মজুত রয়েছে ২৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৮৫ মেট্রিক টন। এর বিস্তারিত হিসাব নিচে দেওয়া হলো:
- চাল: ১৯ লাখ ৬৬ হাজার ১৪৮ মেট্রিক টন
- গম: ২ লাখ ৮০ হাজার ১০ মেট্রিক টন
- ধান (চালে রূপান্তরিত হিসাব): ১ লাখ ৫২ হাজার ১০৯ মেট্রিক টন
এই বিশাল পরিমাণ মজুত থাকার ফলে দেশে আগামী দিনগুলোতে চাল বা গমের কোনো সংকট তৈরি হওয়ার বিন্দুমাত্র আশঙ্কা নেই।
খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষায় সরকারের অঙ্গীকার
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, দেশের সাধারণ নাগরিকের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিশুদের অপুষ্টি দূর করা এবং সামাজিক সুরক্ষাকে আরও জোরদার করতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন।
সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়াতে আগামীতে এই ধরনের জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা হবে। সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে দেশের লাখ লাখ দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের স্বস্তি ফিরে এসেছে।




