পবিত্র হজ পালনের ইচ্ছা প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে থাকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিমান ভাড়া ও সার্বিক খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে অনেকেই বাজেট নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান। সেই চিন্তা থেকে সাধারণ ও ধর্মপ্রাণ মানুষদের মুক্তি দিতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। ২০২৬ সালের হজের বিমান ভাড়া আরও ২৫ হাজার টাকা কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের হজযাত্রীদের বড় একটি আর্থিক সাশ্রয় হবে। এতে করে আরও বেশি মানুষ সহজ ও সুন্দর পরিবেশে আল্লাহর ঘর জিয়ারত করার সুযোগ পাবেন। সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে হজ এজেন্সির প্রতিনিধিরা।
জাতীয় হজ ও ওমরাহ ফেয়ার-২০২৬-এ বড় ঘোষণা
রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী ‘জাতীয় হজ ও ওমরাহ ফেয়ার-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেওয়া হয়। মেলাটির আয়োজন করেছে হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি জানান, সরকার দেশের সাধারণ মানুষের সুবিধা এবং হজযাত্রীদের খরচ কমানোকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় এ বছর প্রতি টিকিটে ২৫ হাজার টাকা কমানোর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালে নতুন হজের বিমান টিকিটের দাম কত?
এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, নতুন ছাড় যুক্ত হওয়ার পর ২০২৬ সালের হজে বিমান টিকিটের দাম নির্ধারিত হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
তিনি উল্লেখ করেন যে, গত বছরও সরকার কঠোর চেষ্টা চালিয়ে প্রতিটি টিকিটের ওপর ১২ হাজার টাকা খরচ কমাতে সক্ষম হয়েছিল। এবারও দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনার পর আরও ২৫ হাজার টাকা কমানো সম্ভব হলো। ফলে গত দুই বছরের ব্যবধানে বিমান ভাড়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ছাড় পেলেন বাংলাদেশের হজযাত্রীরা।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’: হয়রানিমুক্ত ও কম খরচে হজ
বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
সরকারের মূল লক্ষ্য হলো দেশের মানুষকে একটি সুন্দর, স্বচ্ছ এবং সহজ ব্যবস্থা উপহার দেওয়া। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান:
- হয়রানি বন্ধ করা: হজযাত্রীরা যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
- যৌক্তিক হজ প্যাকেজ: হজ প্যাকেজের খরচ কীভাবে আরও যৌক্তিক ও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা যায়, তা নিয়ে প্রতিদিন কাজ চলছে।
- সৌদি ট্যাক্স কমানোর আবেদন: সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে যে নির্মাণ কর বা অতিরিক্ত ট্যাক্স রয়েছে, তা কমানোর জন্য সৌদি সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া ও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কম খরচে থাকার সুবিধায় সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা
হজ পালনের ক্ষেত্রে বিমান ভাড়ার পরেই সবচেয়ে বড় খরচ হয় সৌদি আরবে গিয়ে থাকা বা আবাসনের ওপর। হাজিরা যেন সেখানে কম খরচে ভালো মানের হোটেলে থাকতে পারেন, সে বিষয়েও কাজ করছে সরকার।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশি হাজিদের আবাসন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে খুব ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তারা যেন বিশেষ সুবিধায় ভালো জায়গায় কম খরচে থাকতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে যৌথভাবে কাজ করা হচ্ছে। এর ফলে সামগ্রিক হজ প্যাকেজের খরচ আরও কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণা করলে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি
হজযাত্রীদের কষ্টের উপার্জনের টাকা যেন কোনো অসাধু ব্যক্তি বা ভুয়া এজেন্সির হাতে পড়ে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর বার্তা দিয়েছে সরকার।
প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, কোনো হজ এজেন্সি বা ব্যক্তি যদি হজযাত্রীদের সাথে বিন্দুমাত্র প্রতারণা বা অসদুপায় অবলম্বন করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। সরকারের এই কড়া বার্তায় হজযাত্রীদের মনে আশার আলো ফুটে উঠেছে।
হজের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
৯৫ শতাংশ হাজি যান বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ধর্মসচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ এনডিসি। তিনি হজের ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান:
- বর্তমানে বাংলাদেশের মোট হজযাত্রীদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ সরকারি ব্যবস্থাপনায় সৌদি আরব যান।
- বাকি ৯৫ শতাংশ হজযাত্রীই বেসরকারি বিভিন্ন হজ এজেন্সির মাধ্যমে হজ পালন করতে যান।
তিনি হজ এজেন্সির মালিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা সরকারের একটি বড় অংশীদার। এমন কোনো কাজ বা অবহেলা করা যাবে না যা দেশের বা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। হাজিদের সেবাকে ব্যবসা হিসেবে না দেখে একটি পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করার জন্য তিনি এজেন্সিগুলোর প্রতি আকুল আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য অতিথিবৃন্দ
জাতীয় হজ ও ওমরাহ ফেয়ারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের হজ ও পর্যটন খাতের শীর্ষস্থানীয় বহু কর্মকর্তা ও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রাজকীয় সৌদি দূতাবাসের উপ-মিশন প্রধান খালিদ সাঈদ আল হাদাল, হাব-এর কেন্দ্রীয় নেতারা এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শত শত হজপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষ। মেলার স্টলগুলোতে এখন থেকেই হজের প্রস্তুতি, প্যাকেজের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে হজযাত্রীদের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
হজের খরচ দিন দিন যেভাবে বাড়ছিল, তাতে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য হজ পালন করা একটি বড় স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে বিমান ভাড়া একবারে ২৫ হাজার টাকা কমায় প্রতিটি পরিবার কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে।
বিমান ভাড়া ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় নেমে আসায় পুরো হজ প্যাকেজের দাম আগের চেয়ে অনেকটাই সাশ্রয়ী হবে। সরকারের এই পদক্ষেপ সাধারণ মানুষকে অনেক অনুপ্রাণিত করেছে এবং ২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ হজ পালন করতে যেতে পারবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।




