মঙ্গলবার, জুন ১৬, ২০২৬

হাম না চিকেন পক্স, বুঝবেন যেভাবে: লক্ষণ ও চেনার সহজ উপায়

বহুল পঠিত

ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে ঘরে ঘরে শিশুদের মধ্যে নানা ধরনের সংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। ভাইরাসজনিত এসব রোগের শুরুর দিকের উপসর্গগুলো প্রায় একই রকম থাকে যেমন তীব্র জ্বর, সর্দি-কাশি এবং ত্বকে ছোট ছোট র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি। ফলে অনেক অভিভাবকই মারাত্মক দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান যে শিশুটি আসলে হামে আক্রান্ত নাকি চিকেন পক্সে (জলবসন্ত)।

ভুল চিকিৎসার হাত থেকে শিশুকে রক্ষা করতে এই দুই রোগের তফাত এবং অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি চেনার উপায় জানা অত্যন্ত জরুরি। চলুন ক্লিনিক্যাল তথ্যের আলোকে রোগগুলোর ভিন্নতা সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক।

১. হাম (Measles): লক্ষণ ও চেনার উপায়

হাম ‘রুবেওলা’ ভাইরাসের কারণে হওয়া একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা প্রথমে শিশুর শ্বাসযন্ত্রকে আক্রমণ করে। এটি এতটাই ছোঁয়াচে যে, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ১০ জন অসুরক্ষিত মানুষের মধ্যে ৯ জনই এতে সংক্রমিত হতে পারেন।

  • লক্ষণ: ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৭ থেকে ১৪ দিন পর লক্ষণ প্রকাশ পায়। শুরুতে তীব্র শুষ্ক কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং চোখ দিয়ে পানি পড়ার সঙ্গে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উচ্চ জ্বর হতে পারে।
  • চেনার আসল উপায়: জ্বর ও কাশির ২-৩ দিন পর প্রথম লক্ষণ হিসেবে শিশুর মুখের ভেতর গালের ভেতরের অংশে ছোট ছোট সাদাটে দাগ দেখা যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কোপলিক স্পট’ বলা হয়।
  • ফুসকুড়ির ধরন: এর ৩-৫ দিন পর ত্বকে লালচে বা বাদামি রঙের সামান্য উঁচু ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এই ফুসকুড়ি প্রথমে মুখ, ঘাড় ও কানের পেছন থেকে শুরু হয়ে ধাপে ধাপে নিচের দিকে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ৫-৬ দিন পর এগুলো আস্তে আস্তে কমতে শুরু করে।

২. জলবসন্ত বা চিকেনপক্স (Chickenpox): লক্ষণ ও চেনার উপায়

এটি ‘ভেরিসেলা-জোস্টার’ ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট আরেকটি অতি সংক্রামক রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে বা রোগীর ফুসকুড়ির তরল সরাসরি স্পর্শ করলে ছড়ায়।

  • লক্ষণ: ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ১০ থেকে ২১ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়। হালকা থেকে মাঝারি জ্বর, মাথাব্যথা ও শীত শীত ভাবের ১-২ দিনের মধ্যেই সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
  • চেনার আসল উপায়: চিকেন পক্সের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, রোগীর শরীরে একই সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ফুসকুড়ি দেখা যেতে পারে অর্থাৎ কিছু ফোঁস্কা নতুন উঠছে, কিছু পানি ভর্তি হয়ে আছে, আবার কিছু শুকিয়ে খোসা বা পাঁচড়ার মতো রূপ নিয়েছে।
  • ফুসকুড়ির ধরন: হামের ফুসকুড়ির মতো এগুলো কেবল লালচে দাগ নয়, বরং খুব দ্রুত পানি বা পুঁজে ভর্তি টসটসে ফোঁস্কায় পরিণত হয় এবং এতে মারাত্মক চুলকানি থাকে। এই দানাগুলো প্রথমে পেট ও পিঠে দেখা দেয় এবং পরে হাত, পা ও সারা শরীরে ছড়ায়।

একই রকম উপসর্গের আরও কিছু রোগ

জ্বর ও ত্বকে দানা বা র‍্যাশ হলেই তা হাম বা পক্স নাও হতে পারে। এই সময়ে আরও কিছু রোগ একই রকম উপসর্গ নিয়ে দেখা দিতে পারে:

  • জার্মান মিজলস বা রুবেলা: এটি তুলনামূলক হালকা সংক্রমণ। এর প্রধান বিশেষত্ব হলো কানের পাশে, পেছনে এবং গলার লসিকাগ্রন্থি (গ্ল্যান্ড) ফুলে যায় ও ব্যথা করে। ফুসকুড়িগুলো হালকা লাল দানার মতো হয় এবং ৩ দিনের মধ্যে মিলিয়ে যায়।
  • হ্যান্ড-ফুট-মাউথ ডিজিজ: সাধারণত ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের এই রোগ বেশি হয়। এতে জ্বরের পাশাপাশি মুখের ভেতরে ঘা এবং হাতের তালু ও পায়ের পাতায় ফোসকার মতো দানা ওঠে।
  • ডেঙ্গু: তীব্র জ্বর ও মাথাব্যথা শুরু হওয়ার ২-৩ দিন পর ত্বকে ছোট ছোট লাল দানা বা র‍্যাশ দেখা দেয়, যা দেখতে অনেকটা হামের মতোই এবং এগুলো কখনো কখনো বেশ চুলকায়।
  • মেনিনগোকক্কেমিয়া: এটি ব্যাকটেরিয়াজনিত একটি অত্যন্ত মারাত্মক ও জরুরি অবস্থা, যা সাধারণত ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের হয়। তীব্র জ্বর, বমির সাথে ত্বকে ছোট ছোট বেগুনি বা বাদামি রঙের ছোপ দেখা দেয়। এতে দ্রুত চিকিৎসা না দিলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

জটিলতা ও অভিভাবকের করণীয়

হাম ও চিকেনপক্স উভয় রোগই সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই সেরে যায়। তবে সঠিক যত্ন না নিলে হামের কারণে কান পাকা, তীব্র ডায়রিয়া, অন্ধত্ব, নিউমোনিয়া এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ হতে পারে।

বিশেষ সতর্কবার্তা: জ্বর ও ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কেবল প্যারাসিটামল দেওয়া যাবে। তবে এসব ভাইরাল অসুস্থতায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে ভুলেও অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ দেওয়া যাবে না, এতে ‘রে’স সিনড্রোম’ নামক মারাত্মক লিভার ও মস্তিষ্কের জটিলতার ঝুঁকি থাকে।

ঘরে যা করবেন

  • রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে এবং শরীর হাইড্রেটেড রাখতে প্রচুর পানি, ডাবের পানি বা তরল খাবার খাওয়াতে হবে।
  • হামের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে দুই দিন ভিটামিন এ সম্পূরক (Vitamin A Supplement) খাওয়ানো চিকিৎসার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
  • ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার ৪ দিন আগে থেকে ৪ দিন পর পর্যন্ত হামের রোগী সবচেয়ে বেশি সংক্রামক থাকেন। তাই রোগীকে আলাদা ঘরে (আইসোলেশন) রাখা জরুরি।

কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন

হাম বা পক্সের কারণে যদি শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয়, প্রচণ্ড জ্বর কোনোভাবেই না কমে, তীব্র মাথাব্যথা বা শিশু অজ্ঞান বা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।


হাম এবং চিকেনপক্স উভয় রোগই ভ্যাকসিনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। এমএমআর (MMR) টিকার দুটি ডোজ হামের বিরুদ্ধে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়। এছাড়া হাম আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নিলে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। শিশুদের সঠিক সময়ে টিকাদান নিশ্চিত করা এবং আক্রান্তদের আলাদা রাখাই এই রোগগুলো ছড়ানো বন্ধ করার একমাত্র উপায়।

আরো পড়ুন

১০ জেলায় আইসিইউ চালু: জেলা সদর হাসপাতালেই এখন মিলবে জরুরি ও উন্নত চিকিৎসাসেবা

আমাদের দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ের রোগীদের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট ছিল নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ (ICU)। যেকোনো জরুরি বা জটিল রোগে আক্রান্ত মুমূর্ষু...

বালিশের নিচে রসুন রাখার উপকারিতা: রাতে ঘুমানোর আগে কেন রাখবেন ১ কোয়া রসুন?

রসুন আমাদের সবার রান্নাঘরের অত্যন্ত পরিচিত একটি উপাদান। তরকারির স্বাদ বাড়ানো থেকে শুরু করে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে রসুনের জুড়ি মেলা ভার। রসুনকে শুধু একটি...

সপ্তাহে মাত্র দুই ঘণ্টা ভার উত্তোলন বাড়াতে পারে আয়ু, বলছে গবেষণা

সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের সবারই থাকে। আর এর জন্য সুষম খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত হাঁটাচলা করার পরামর্শ চিকিৎসকরা সবসময়ই দিয়ে থাকেন।...
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ