ইসমে আজম দোয়া (Isme Azam Dua) ইসলামের অন্যতম শক্তিশালী একটি দোয়া। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, মহান আল্লাহর এমন একটি নাম বা দোয়া রয়েছে, যা পাঠ করে দোয়া করলে আল্লাহ তা অবশ্যই কবুল করেন এবং যা চাইলে তা-ই দান করেন। সেই মহান নাম বা দোয়াই হলো ‘ইসমে আজম’।
আজকে আমরা ইসমে আজম দোয়ার সঠিক উচ্চারণ, অর্থ, ফজিলত এবং এটি পাঠ করার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।
ইসমে আজম দোয়া পরিচিতি | Isme Azam Dua
সংজ্ঞা
‘ইসমে আজম’ (اسم اعظم) আরবি শব্দ। ‘ইসম’ অর্থ নাম এবং ‘আজম’ অর্থ মহান বা শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ, ইসমে আজম অর্থ হলো “আল্লাহর মহান নাম”। ওলামায়ে কেরাম ও মুহাদ্দিসগণের মতে, এটি এমন একটি বিশেষ দোয়া বা নাম, যার মাধ্যমে আল্লাহকে ডাকলে তিনি বান্দার ডাকে সাড়া দিতে বিলম্ব করেন না।
কবে এবং কেন পড়া হয়?
মানুষ যখন চরম বিপদ, মুসিবত বা কোনো বিশেষ হাজত (প্রয়োজন) পূরণের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়, তখন ইসমে আজম দোয়া পড়া হয়। এটি মূলত আল্লাহর বড়ত্ব ও একত্ববাদের স্বীকৃতি দিয়ে তার কাছে মিনতি করার মাধ্যম।
ইসলামে ইসমে আজম দোয়ার গুরুত্ব
রাসূলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সময়ে সাহাবীদের এই দোয়ার গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। হযরত বুরায়দা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এক ব্যক্তিকে এই দোয়াটি পড়তে শুনে বললেন, “শপথ সেই সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয়ই এই ব্যক্তি আল্লাহকে তাঁর ‘ইসমে আজম’ বা সুমহান নামের উসিলায় ডাকল। যে নামের উসিলায় ডাকলে তিনি সাড়া দেন এবং যা চাইলে তিনি দান করেন।” (তিরমিজি: ৩৪৭৫, আবু দাউদ: ১৪৯৩)
ইসমে আজম দোয়ার আরবি ও বাংলা উচ্চারণ
সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী ইসমে আজম দোয়াটি নিচে দেওয়া হলো:
আরবি উচ্চারণ
اَللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنِّي أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ
বাংলা উচ্চারণ
“আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা বি-আন্নি আশহাদু আন্নাকা আনতাল্লাহু, লা-ইলাহা ইল্লা আনতাল আহাদুস সামাদ, আল্লাজি লাম-ইয়ালিদ ওয়া লাম-ইউলাদ, ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ।”
বাংলা অর্থ
“হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি এই উসিলায় যে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি- তুমিই আল্লাহ। তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তুমি একক, অমুখাপেক্ষী। যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও কেউ জন্ম দেয়নি। আর তার সমকক্ষ কেউ নেই।”
ইসমে আজম দোয়ার ফজিলত
এই দোয়াটি পাঠ করার অসংখ্য ফজিলত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। নিচে প্রধান কিছু ফজিলত আলোচনা করা হলো:
১. দোয়া কবুলের নিশ্চয়তা
ইসমে আজম দোয়ার সবচেয়ে বড় ফজিলত হলো, এর মাধ্যমে দোয়া করলে আল্লাহ তা ফেরত দেন না। রাসূল (সা.) এর হাদিস অনুযায়ী, এই দোয়ার মাধ্যমে যা চাওয়া হয়, আল্লাহ তা কবুল করেন।
২. ইসমে আজম দোয়া পড়ার সওয়াব
এটি আল্লাহর তাওহীদ বা একত্ববাদের শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি। তাই এটি পাঠ করলে ঈমান মজবুত হয় এবং অশেষ নেকি হাসিল হয়।
৩. জীবনের সমস্যার সমাধান
পারিবারিক অশান্তি, ব্যবসায়িক ক্ষতি বা যেকোনো জটিল পরিস্থিতিতে এই দোয়া পাঠ করলে আল্লাহ তায়ালা চাইলে এই দোয়ার অছিলায় গায়েবি মদদ দান করে এবং সমস্যা সমাধান সহজ করে দিতে পারেন।
৪. রোগ-ব্যাধি ও বিপদ থেকে রক্ষা
দুরারোগ্য ব্যাধি কিংবা আকস্মিক বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পেতে ইসমে আজম একটি শক্তিশালী ঢালস্বরূপ।
.অন্যান্য বর্ণিত ইসমে আজম দোয়া
উপরে বর্ণিত দোয়াটি ছাড়াও আরও কয়েকটি শব্দ বা বাক্যকে ইসমে আজম বলা হয়েছে। যেমন:
- আয়াতুল কুরসি: অনেক মুহাদ্দিস আয়াতুল কুরসিকে ইসমে আজম বলেছেন।
- দোয়া ইউনুস: “লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালোমিন।”
- ইয়া হাইয়্যু ইয়া ক্বাইয়্যুম: হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে একেও ইসমে আজম বলা হয়েছে।
৬. ধর্মীয় ও মানসিক উপকারিতা
এটি পাঠে অন্তরে প্রশান্তি আসে এবং আল্লাহর প্রতি ভরসা বাড়ে, যা মানসিক দুশ্চিন্তা দূর করতে সাহায্য করে।
ইসমে আজম দোয়া পাঠের নিয়ম
যেকোনো আমল কবুল হওয়ার জন্য সঠিক নিয়ম মানা জরুরি।
সঠিক সময় ও পদ্ধতি
যদিও এই দোয়া যেকোনো সময় পড়া যায়, তবে তাহাজ্জুদের সময়, ফরজ নামাজের পরে (বিশেষ করে আসরের পর) এবং সিজদাহরত অবস্থায় পড়া সবচেয়ে উত্তম হতে পারে। জুমার দিন আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়টিও দোয়া কবুলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশুদ্ধ অবস্থায় পড়ার নিয়ম
- ওজু করে পবিত্র অবস্থায় বসুন।
- কেবলামুখী হয়ে বসা উত্তম।
- বিনয় ও নম্রতার সাথে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করুন।
- দু’আ করার আগে আল্লাহর তা’আলার প্রশংসা ও রাসূলের প্রতি দরূদ পাঠ করুন
নিয়মিত পাঠের গুরুত্ব
বিপদের সময় ছাড়াও সুখে-দুখে সব সময় এই দোয়া পাঠ করা উচিত। নিয়মিত পাঠ করলে আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক গভীর হয়।
ইসমে আজম দোয়া মুখস্থ করার কৌশল
দোয়াটি কিছুটা দীর্ঘ মনে হতে পারে, তবে নিচের কৌশলগুলো অবলম্বন করলে সহজেই মুখস্থ করা যাবে।
১. ধাপে ধাপে মুখস্থ করা
পুরো দোয়াটি একবারে না পড়ে ৩-৪টি অংশে ভাগ করে নিন। প্রতিদিন একটি করে অংশ মুখস্থ করুন।
২. অডিওর সাহায্যে শেখা
ইন্টারনেটে বা ইউটিউবে ‘ইসমে আজম দোয়া’ লিখে সার্চ দিয়ে অডিও শুনুন। শুনে শুনে পড়া মুখস্থ করা সহজ হয় এবং উচ্চারণ শুদ্ধ হয়।
৩. অর্থ বুঝে মুখস্থ করার উপায়
দোয়াটির বাংলা অর্থ ভালো করে বুঝে নিন। যখন আপনি জানবেন আপনি কী বলছেন, তখন এটি মনে রাখা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
ইসমে আজম দোয়া সম্পর্কিত FAQ (সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন)
পাঠকদের মনে এই দোয়া নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকে। নিচে গুরত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
প্রশ্ন: ইসমে আজম দোয়া কি?
উত্তর: এটি আল্লাহর মহান নাম সম্বলিত একটি বিশেষ দোয়া, যা পাঠ করে দোয়া করলে আল্লাহ তা নিশ্চিতভাবে কবুল করেন।
প্রশ্ন: কবে পড়া উচিত?
উত্তর: যেকোনো বিপদে, বিশেষ প্রয়োজনে বা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য যেকোনো সময় পড়া যায়। তবে তাহাজ্জুদ ও জুমার দিন বিশেষ ফলদায়ক।
প্রশ্ন: ইসমে আজম দোয়ার ফজিলত কী?
উত্তর: এর প্রধান ফজিলত হলো এর মাধ্যমে করা দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না। এটি রিজিক বৃদ্ধি, বিপদ মুক্তি ও গুনাহ মাফের উসিলা।
প্রশ্ন: রোগ-ব্যাধি দূর করতে কি ইসমে আজম দোয়া কার্যকর?
উত্তর: হ্যাঁ, অত্যন্ত কার্যকর। আল্লাহর কাছে সুস্থতা চেয়ে এই দোয়ার মাধ্যমে প্রার্থনা করলে তিনি শিফা দান করেন।
প্রশ্ন: শিশু বা নতুনদের জন্য কিভাবে শেখানো যায়?
উত্তর: ছোট ছোট অংশে ভাগ করে এবং অডিও শুনিয়ে তাদের শেখানো যেতে পারে।
প্রশ্ন: মহিলারা কি মাসিক অবস্থায় ইসমে আজম পড়তে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, পারে। মাসিক অবস্থায় জিকির-আজকার বা দোয়া হিসেবে ইসমে আজম পড়তে কোনো বাধা নেই। মনে মনে বা মুখে উচ্চারণ করে পড়া যাবে।
প্রশ্ন: ইসমে আজম কি শুধু ফরয নামাজের পরই পড়তে হয়?
উত্তর: না, এটি নফল নামাজের সিজদায়, শেষ বৈঠকে (তাশাহুদের পর), তাহাজ্জুদে বা দিনের যেকোনো সময় পড়া যায়। তবে ফরজ নামাজের পর পড়া উত্তম।
প্রশ্ন: ইসমে আজম পড়লে কি সকল গুনাহ মাফ হয়?
উত্তর: খালিস নিয়তে তওবা করে এই দোয়া পড়লে আল্লাহ বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন ইনশাআল্লাহ।
প্রশ্ন: দোয়া কবুলের জন্য ইসমে আজমের নিয়ত কেমন হওয়া উচিত?
উত্তর: নিয়ত হতে হবে সম্পূর্ণ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং হারাম কোনো কিছু চাওয়া যাবে না। দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে আল্লাহ শুনছেন।
প্রশ্ন: ইসমে আজম আমলের সবচেয়ে শক্তিশালী ধাপ কোনটি?
উত্তর: চোখের পানি ফেলে একান্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহর কাছে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে দোয়া চাওয়াটাই হলো শক্তিশালী ধাপ।
প্রশ্ন: ইসমে আজম কতবার পড়লে দোয়া কবুল হয়? / কতবার পড়তে হয়?
উত্তর: এর কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা হাদিসে উল্লেখ নেই। তবে বেজোড় সংখ্যায় (৩, ৭, ১১ বার) পড়া উত্তম। যত বেশি পড়বেন, তত ভালো।
প্রশ্ন: ইসমে আজম আমলের সঠিক সময় কোনটি?
উত্তর: রাতের শেষ তৃতীয়াংশ (তাহাজ্জুদ) হলো দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়।
প্রশ্ন: ইসমে আজম কি একটি নির্দিষ্ট নাম?
উত্তর: এ নিয়ে আলেমদের মতভেদ আছে। কেউ বলেন ‘আল্লাহ’ শব্দটিই ইসমে আজম, কেউ বলেন ‘আল-হাইয়্যু আল-ক্বাইয়্যুম’, আবার কেউ উপরের বর্ণিত দোয়াটিকে ইসমে আজম বলেছেন। সবগুলোর ওপর আমল করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রশ্ন: ইয়া হাইয়্যু ইয়া ক্বাইয়্যুম কি ইসমে আজম?
উত্তর: হ্যাঁ, অনেক মুহাদ্দিসের মতে এটিও ইসমে আজম। রাসূল (সা.) বিপদের সময় এই নামে আল্লাহকে ডাকতেন।
প্রশ্ন: ইসমে আজম দ্বারা কী কী চাওয়া যায়?
উত্তর: দুনিয়া ও আখেরাতের যেকোনো কল্যাণকর বস্তু, যেমন- সুস্থতা, সম্পদ, নেক সন্তান, জান্নাত ইত্যাদি চাওয়া যায়।
প্রশ্ন: আমল করার আগে কী কী শর্ত মানতে হয়?
উত্তর: হালাল রুজি ভক্ষণ করা, পবিত্র থাকা এবং পূর্ণ ইমান ও বিশ্বাস রাখা।
প্রশ্ন: ইসমে আজম কোথায় বর্ণিত আছে?
উত্তর: সুনানে আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ ও নাসায়ী শরিফের বিভিন্ন হাদিসে এটি বর্ণিত হয়েছে।
প্রশ্ন: ইসমে আজম পাঠ করলে কি রিজিক বাড়ে?
উত্তর: হ্যাঁ, আল্লাহর কাছে রিজিক চেয়ে এই দোয়া পড়লে তিনি বরকত দান করেন।
প্রশ্ন: ইসমে আজম পড়ার সময় কি দরুদ শরীফ পড়তে হয়?
উত্তর: দোয়ার শুরু এবং শেষে দরুদ শরীফ পড়া দোয়া কবুলের অন্যতম শর্ত ও শিষ্টাচার। এতে দোয়া দ্রুত কবুল হয়।
প্রশ্ন: ইসমে আজম পড়লে কি দোয়া কবুল হয়?
উত্তর: ইনশাআল্লাহ, হাদিসের ভাষ্যমতে এই দোয়ার উসিলায় আল্লাহ দোয়া কবুল করেন।
আপনার জন্য আমাদের পরামর্শ: ইসমে আজম দোয়া কেবল মুখে আউড়ানোর বিষয় নয়, এটি হৃদয়ের বিশ্বাস। আজ থেকেই আপনার প্রতিদিনের দোয়ায় এই মহান বাক্যগুলো যুক্ত করুন এবং আল্লাহর অশেষ রহমতের সাক্ষী হন।
কুরআনের অন্যান্য কিছু সূরার বাংলা অর্থও ও উচ্চারণ:
১. সূরা কাফিরুন: বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত
২. সূরা আসর বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত
৩. সূরা ফাতিহা বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত
৪. সূরা আদ দুহার বাংলা উচ্চারণ, অর্থ, তাফসীর ও ফজিলত
৫. সূরা মাউন বাংলা উচ্চারণসহ অর্থ ও ফজিলত
৬. সূরা লাহাব বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও তাফসীর
৭. সূরা ইখলাস – বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত
৮. সূরা ফালাকের বাংলা উচ্চারণ, আরবি, অর্থ ও তাফসীর
৯. সূরা ফীল বাংলা উচ্চারণ, আরবি, অর্থ, তাফসীর ও ফজিলত – সম্পূর্ণ গাইড
১০. সূরা কদরের বাংলা অর্থ ও উচ্চারণ: লাইলাতুল কদরের মহিমা, আমল ও ফজিলত
১১. পড়া মনে রাখার দোয়া, অর্থ ও ফজিলত
১২. সূরা কাউসারের বাংলা অর্থ ও উচ্চারণ
১৩. সূরা নাসের বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
১৪. দরুদ শরীফের বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ | ফজিলত, ব্যাখ্যা সহ সম্পূর্ণ গাইড