সোমবার, জুন ১, ২০২৬

মরণোত্তর জাতিসংঘ পদক পাচ্ছেন ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী: বীরদের সর্বোচ্চ সম্মাননা

বহুল পঠিত

বিশ্বের বুকে শান্তি প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত নিয়ে দায়িত্ব পালনকালে জীবন উৎসর্গকারী ছয় বীর বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীকে মরণোত্তর ‘ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক’ (Dag Hammarskjöld Medal) দিচ্ছে জাতিসংঘ। আফ্রিকার বিতর্কিত ও ঝুঁকিপূর্ণ আবেই (Abyei) অঞ্চলে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে এই ছয় বাংলাদেশি সেনা সদস্য শহীদ হয়েছিলেন।

জাতিসংঘের সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত একটি বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। আগামী ৫ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটি মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিজ হাতে এই পদক তুলে দেবেন।

পদকপ্রাপ্ত ৬ বাংলাদেশি বীর শান্তিরক্ষীর পরিচয়

আফ্রিকার বুকে শান্তির পতাকা ওড়াতে গিয়ে যে ছয়জন বাংলাদেশি তরুণ ও সাহসী শান্তিরক্ষী তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন, তারা হলেন:

১. মো. জাহাঙ্গীর আলম

২. মো. সবুজ মিয়া

৩. মো. মাসুদ রানা

৪. মো. মোমিনুল ইসলাম

৫. শামীম রেজা

৬. সান্ত মণ্ডল

এই ছয় বীর সন্তান বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর গৌরব এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে গিয়ে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। তাদের এই অসামান্য ত্যাগকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই জাতিসংঘ এই মরণোত্তর পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কীভাবে ঘটেছিল সেই মর্মান্তিক ঘটনা?

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর আফ্রিকার আবেই অঞ্চলে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী নিরাপত্তা বাহিনীতে (UNISFA) অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছিলেন এই বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। আবেই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং জাতিগত সংঘাতের কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত।

সেদিন দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় হঠাৎ করেই একটি আকস্মিক ও কাপুরুষোচিত ড্রোন হামলার শিকার হন তারা। ড্রোন হামলায় ঘটনাস্থলেই এই ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী প্রাণ হারান। এই বর্বরোচিত ঘটনাটি তখন দেশে এবং আন্তর্জাতিক মহলে গভীর শোক ও নিন্দার ঝড় তুলেছিল। তবে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা বিশ্বশান্তি বজায় রাখার যে দায়িত্ব পালন করে গেছেন, আজ তারই সর্বোচ্চ স্বীকৃতি দিচ্ছে জাতিসংঘ।

আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসের আয়োজন

আগামী ৫ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে এক বিশেষ স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ১৯৪৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারানো বিশ্বের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বীর শান্তিরক্ষীর স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন এবং তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবেন।

এরপর মূল অনুষ্ঠানে গত বছর (২০২৫ সাল) কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত ৫৯ জন শান্তিরক্ষীসহ মোট ৬৮ জন সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক শান্তিরক্ষীকে মরণোত্তর ‘ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক’ দেওয়া হবে। এই সম্মাননা তালিকায় বাংলাদেশের এই ছয় বীর শান্তিরক্ষীর নাম অত্যন্ত গৌরবের সাথে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবস্থান ও অবদান

বাংলাদেশ বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সামরিক ও পুলিশ সদস্য প্রেরণে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করে ধরে রেখেছে। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি এবং বিশ্বশান্তির প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জটিল ও প্রতিকূল পরিবেশেও বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন।

বর্তমানে যেসব মিশনে বাংলাদেশি সদস্যরা কর্মরত আছেন

  • আবেই (Abyei)
  • মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র (CAR)
  • সাইপ্রাস (Cyprus)
  • গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (DR Congo)
  • লেবানন (Lebanon)
  • লিবিয়া (Libya)
  • দক্ষিণ সুদান (South Sudan)
  • পশ্চিম সাহারা (Western Sahara)

বর্তমানে এই জটিল মিশনগুলোতে ২৭৭ জন নারী সদস্যসহ মোট ৪ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর সদস্য দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের বীরত্ব ও মানবিক আচরণের কারণে মিশন এলাকাগুলোতে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বিশ্বস্ত নাম।

বিশ্বজুড়ে শান্তিরক্ষীদের বর্তমান চ্যালেঞ্জ

জাতিসংঘের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সবচেয়ে জটিল, ঝুঁকিপূর্ণ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবেশে ৫০ হাজারেরও বেশি বেসামরিক, সামরিক ও পুলিশ শান্তিরক্ষী নিয়োজিত রয়েছেন।

বিশ্বের মোট ১১৮টি দেশ জাতিসংঘের অধীনে পরিচালিত ১১টি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের জনবল সরবরাহ করছে। বর্তমান যুগে ড্রোনের ব্যবহার, আধুনিক ল্যান্ডমাইন এবং বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর চোরাগোপ্তা হামলার কারণে শান্তিরক্ষীদের কাজের পরিবেশ দিন দিন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েও বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা যেভাবে নিজেদের জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন, তা বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত হচ্ছে।


বিশ্বের যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে বাংলাদেশের এই ছয় বীর শান্তিরক্ষী যে আত্মত্যাগ করেছেন, তা কোনোদিন ভোলার নয়। “জাতিসংঘ পদক পাচ্ছেন ৬ বাংলাদেশি” এই খবরটি একই সাথে আমাদের জন্য গভীর বেদনার এবং পরম গৌরবের। আগামী ৫ জুন নিউইয়র্কের মাটিতে যখন তাদের নাম প্রতিধ্বনিত হবে, তখন সমগ্র বিশ্ব আরও একবার শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করবে বাংলাদেশের অবদানকে। শহীদানদের এই মহান ত্যাগ দেশের তরুণ প্রজন্মকে দেশপ্রেম এবং বিশ্ব মানবতার সেবায় উদ্বুদ্ধ করবে। আমরা এই ছয় বীর শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।

আরো পড়ুন

মিনায় পৌঁছেছেন হজযাত্রীরা, হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে আজ

পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে আজ। এই মহাসম্মেলনে অংশ নিতে সারাবিশ্ব থেকে আগত লাখ লাখ হাজি নিজেদের প্রস্তুত করছেন। রোববার (২৪ মে) এশার...

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির ইঙ্গিত: দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে না যাওয়ার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেবে না—এমন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তিনি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রেখে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা।

পাকিস্তান–আফগানিস্তান উত্তেজনায় ‘অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি’ চান অ্যান্তোনিও গুতেরেস

দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তান–এর মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ