সোমবার, জুন ১, ২০২৬

বিশ্বকাপ যাত্রার আগে পানামাকে উড়িয়ে দিল ব্রাজিল: মারাকানায় সেলেসাওদের গোল উৎসব

বহুল পঠিত

বিশ্বকাপের মেগা মঞ্চে মিশন শুরু করার আগে নিজেদের ঘরের মাঠে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে নেমেছিল ব্রাজিল। ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচ থেকে ব্রাজিলের সমর্থক ও কোচিং স্টাফ যা যা আশা করেছিলেন, তার সবটাই যেন উজাড় করে দিয়েছে দলটি। ৭০ হাজারের বেশি দর্শকে ঠাসা গ্যালারির সামনে আক্রমণাত্মক ফুটবলের এক মাস্টারক্লাস দেখাল কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা। পুরো ম্যাচে প্রতিপক্ষকে কোনো সুযোগ না দিয়ে পানামাকে ৬-২ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে সেলেসাওরা।

ইনজুরির কারণে দলের প্রাণভ্রমরা নেইমার জুনিয়র স্কোয়াডে ছিলেন না। তবে তার অনুপস্থিতি মাঠের খেলায় বিন্দুমাত্র বুঝতে দেননি বাকি ফুটবলাররা। তরুণ ও অভিজ্ঞদের দারুণ এক কম্বিনেশনে পুরো মারাকানাকে ৯০ মিনিট মাতিয়ে রেখেছিল হলুদ জার্সিধারীরা। বিশ্বকাপের ঠিক আগে দলের এমন বিধ্বংসী ফর্ম নিশ্চিতভাবেই সাম্বার দেশের সমর্থকদের মনে হেক্সা বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের নতুন আশা সঞ্চার করেছে।

প্রথমার্ধেই ভিনিসিয়ুস ও কাসেমিরোর দাপট

ম্যাচের শুরু থেকেই পানামাকে চেপে ধরে ব্রাজিল। এতটাই যে, ম্যাচের ঘড়ির কাঁটা ১ মিনিট ছোঁয়ার আগেই লিড নেয় স্বাগতিকরা। পানামার মিডফিল্ড নিজেদের অর্ধে পেছন থেকে আক্রমণ তৈরি করতে গিয়ে মারাত্মক এক ভুল করে বসে। অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার কাসেমিরো সতর্ক থেকে বলটি কেড়ে নেন এবং দ্রুত পাস বাড়ান ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দিকে। রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনি বক্সের বাইরে থেকে, প্রায় ২৩ মিটার দূর থেকে এক অসাধারণ বুলেট গতির শটে বল পানামার জালে পাঠান। গোলরক্ষক মোসকেরার স্রেফ চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না।

তবে গোল খেয়ে দমে যায়নি পানামা। ম্যাচের ১৩ মিনিটে একটি বুদ্ধিদীপ্ত ফ্রি-কিক থেকে গোল করে ম্যাচে ১-১ সমতা ফেরায় তারা। সমতায় ফেরার পর ব্রাজিল আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলশ্রুতিতে ম্যাচের ৩৮ মিনিটে আবারও এগিয়ে যায় সেলেসাওরা। ডিফেন্ডার অ্যালেক্স স্যান্ড্রো বাম প্রান্ত দিয়ে ভিনিসিয়ুসকে খুঁজে নেন। ভিনি তার চেনা একক দক্ষতায় দুজন ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিংয়ে বোকা বানিয়ে বক্সে নিচু ক্রস করেন। সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা কাসেমিরো চমৎকার হেডে বল জালে জড়ান। রেফারি ভিএআর (VAR) যাচাই করে গোলটি মঞ্জুর করেন। বিরতির ঠিক আগে রাফিনিয়াও গোলের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন, তবে তার শটটি পোস্টের ঘেঁষে বাইরে চলে যায়।

দ্বিতীয়র্ধে ১০ জন বদল এবং আনচেলত্তির নতুন চমক

প্রথমার্ধে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর, বিরতির সময় ডাগআউটে বড় চাল চালেন ব্রাজিলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। বিশ্বকাপের আগে দলের বেঞ্চের শক্তি পরখ করে নিতে তিনি প্রথমার্ধের দল থেকে একসঙ্গে ১০ জন খেলোয়াড় বদলে সম্পূর্ণ নতুন এক দল মাঠে নামান। তবে দল বদলালেও ব্রাজিলের খেলার চেনা ছন্দ এবং ধার একটুও কমেনি, বরং আরও ভয়ঙ্কর রূপ নেয়।

দ্বিতীয়ার্ধের ঠিক ৭ মিনিটে পানামার গোলরক্ষক মোসকেরা বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে আবারও ভুল করেন। সেই সুযোগটি লুফে নিতে ভুল করেননি ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রায়ান। বক্সের ডান দিক থেকে এক দুর্দান্ত কোণাকুণি শটে দলের পক্ষে তৃতীয় গোলটি করেন তিনি। এই গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ম্যাচের ১৪ মিনিটে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের মধ্যে চমৎকার পাস বিনিময়ের পর দলের চতুর্থ গোলটি যোগ করেন মাঝমাঠের তারকা লুকাস পাকেতা।

দ্বিতীয় অর্ধে ব্রাজিলের গোল উৎসবের চিত্র

  • রায়ানের গোল: পানামার গোলরক্ষকের ভুল থেকে চমৎকার ফিনিশিং।
  • লুকাস পাকেতার গোল: দলের সুন্দর পাসিং ফুটবলের নিখুঁত পরিণতি।
  • ইগর থিয়াগোর গোল: পেনাল্টি থেকে ঠান্ডা মাথায় লক্ষ্যভেদ।
  • দানিলোর গোল: পাকেতার পাস থেকে ম্যাচের শেষ গোল।

পেনাল্টি এবং শেষ মুহূর্তের গোলবন্যা

৪-১ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে পানামার রক্ষণভাগ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ম্যাচের কিছুক্ষণ পর বক্সের ভেতরে পানামার ডিফেন্ডার ফাউল করলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। স্পট কিক থেকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় দলের পঞ্চম গোলটি করেন তরুণ ইগর থিয়াগো। ম্যাচের স্কোরলাইন তখন ৫-১।

তবে ব্রাজিলের গোলের ক্ষুধা তখনও মেটেনি। ম্যাচের শেষ দিকে আবারও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন লুকাস পাকেতা। তার পা থেকে আসে একটি রক্ষণভেদী সুন্দর থ্রু বল। সেই বল ধরে বক্সে ঢুকে নিখুঁত নিচু শটে বল জালে জড়ান দানিলো সান্তোস। ফলে ব্রাজিলের গোল সংখ্যা দাঁড়ায় ৬। ম্যাচ শেষের ঠিক আগ মুহূর্তে পানামার পক্ষে সান্ত্বনাসূচক দ্বিতীয় গোলটি করেন হার্ভি। তবে তা কেবল ব্যবধানই কমিয়েছে, ম্যাচের ফলে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।

বিশ্বকাপের আগে সমর্থকদের মনে নতুন আশা

পুরো ম্যাচের শুরু থেকে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত একই গতি ও তাল ধরে রেখে খেলেছে ব্রাজিল। প্রতিপক্ষের ওপর রীতিমতো ছড়ি ঘুরিয়েছে আনচেলত্তির দল। নেইমারহীন এই ব্রাজিল দল যেভাবে টিকিটাকা ও সাম্বা ফুটবলের মিশ্রণে পানামাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল, তা ফুটবল বিশেষজ্ঞদের নজর কেড়েছে। বিশেষ করে দুই অর্ধে দুটি ভিন্ন কম্বিনেশনের দল খেলিয়েও যে একই রকম পারফর্ম্যান্স পাওয়া সম্ভব, তা কোচ হিসেবে আনচেলত্তি প্রমাণ করে দেখালেন।

মারাকানার গ্যালারিতে উপস্থিত ৭০ হাজারেরও বেশি দর্শক ম্যাচ শেষে করতালি দিয়ে দলকে বিদায় জানান। বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নামার আগে এমন একটি বড় জয় দলের আত্মবিশ্বাসকে আকাশচুম্বী করে তুলবে।


“পানামাকে উড়িয়ে দিল ব্রাজিল” এই জয়টি শুধু একটি সাধারণ প্রস্তুতি ম্যাচের জয় নয়, এটি বিশ্বমঞ্চে নামার আগে প্রতিপক্ষ দলগুলোর প্রতি ব্রাজিলের একটি কড়া বার্তা। নেইমার ছাড়াও যে এই দল গোলের বন্যা বইয়ে দিতে পারে, তা আজ প্রমাণিত। রক্ষণভাগ, মধ্যমাঠ থেকে শুরু করে আক্রমণভাগ সবখানেই ব্রাজিলের গভীরতা স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়, মারাকানার এই বিধ্বংসী ফর্ম ধরে রেখে সেলেসাওরা বিশ্বকাপের মূল পর্বেও তাদের সাম্বা ঝড় তুলতে পারে কি না। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ব্রাজিল সমর্থক এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাদের প্রিয় দলের বিশ্বকাপ মিশন দেখার জন্য।

আরো পড়ুন

তামিম ইকবালের পরিকল্পনা: বদলে যাচ্ছে দেশের ক্রিকেট

বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। মাঠের ওপেনার হিসেবে অসংখ্য রেকর্ড গড়া তামিম ইকবাল এবার বিসিবির অ্যাডহক কমিটির সভাপতির চেয়ারে বসে দেশের...

২০০ টাকায় বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সিরিজের টিকিট: কিনবেন যে উপায়ে

ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই হাইভোল্টেজ সিরিজের টিকিট বিক্রি আজ শনিবার (১১ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনলাইনে শুরু হচ্ছে। সাধারণ দর্শকদের...

পাকিস্তান সিরিজ দিয়েই বিশ্বকাপ প্রস্তুতি শুরু বাংলাদেশের: মিরাজ

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে আগামীকাল। মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচকে...
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ