ইসলাম আমাদের জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় কাজকে সুশৃঙ্খল এবং অর্থবহ করার শিক্ষা দেয়। হিজরি বছরের অন্যতম পবিত্র এবং বরকতময় মাস হলো জিলহজ মাস। এই মাসের প্রথম ১০ দিন আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। বিশেষ করে যারা পবিত্র ঈদুল আজহায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কুরবানি করার নিয়ত করেছেন, তাদের জন্য এই দিনগুলোর আমল অনেক তাৎপর্যপূর্ণ।
আমাদের সমাজে একটি সাধারণ প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায় “কুরবানির ঈদের আগে নখ, চুল বা শরীরের পশম কাটা যাবে কি না?” অনেকেই এটিকে সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ মনে করেন, আবার অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। ইসলামি শরিয়তের আলোকে এই বিষয়ের সঠিক ও সহজ ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো।
জিলহজ মাসের গুরুত্ব ও মুমিনের প্রস্তুতি
জিলহজ মাসের আগমন শুধু কুরবানির প্রস্তুতির বার্তা নিয়ে আসে না, বরং এটি মানুষের মনে আত্মত্যাগ, তাকওয়া এবং আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসার এক অনন্য শিক্ষাও জাগিয়ে তোলে। এই বরকতময় দিনগুলোতে একজন ঈমানদার ব্যক্তি নিজের আমল, আচরণ ও ইবাদতের প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়ার চেষ্টা করেন।
কুরবানির নিয়তকারী ব্যক্তির জন্য নখ, চুল ও শরীরের পশম না কাটার যে নির্দেশ হাদিসে এসেছে, তা মূলত আল্লাহর আদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার একটি সুন্দর মাধ্যম। এর মাধ্যমে একজন বান্দা যেন নিজের পুরো অস্তিত্ব নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং ক্ষমার প্রত্যাশায় অপেক্ষা করেন।
নখ ও চুল না কাটার বিষয়ে হাদিস শরিফ কী বলে?
কুরবানির ঈদের আগে নখ ও চুল কাটার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। হাদিস শরিফে এ বিষয়ে অত্যন্ত সুন্দর বিবরণ পাওয়া যায়।
হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন “যার কাছে কুরবানির পশু আছে এবং সে ওটা কুরবানি দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে, আর জিলহজ মাসের চাঁদও দেখা গেছে; সে যেন কুরবানি করার আগে তার চুল ও নখ স্পর্শ না করে (অর্থাৎ না কাটে)।”
তবে মনে রাখতে হবে, যদি জিলহজ মাস এখনও শুরু না হয়, তবে নখ ও চুল কাটাতে কোনো ধরনের বাধা বা নিষেধ নেই।
(তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭, আবু দাউদ: ২৭৯১, তিরমিজি: ১৫২৩, নাসাঈ: ৪৩৬১, ইবনে মাজাহ: ৩১৫০, মুসনাদে আহমদ: ২৬৬৫৪)
এটি কি বাধ্যতামূলক নাকি মুস্তাহাব? ওলামাদের মতামত
হাদিসের এই নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে ফিকহবিদ এবং হানাফি মাজহাবের ইসলামিক স্কলাররা একটি সহজ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, যে ব্যক্তি কুরবানি দেবেন তার জন্য জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার পর থেকে কুরবানির পশু জবাই করার আগ পর্যন্ত নখ, চুল বা শরীরের যেকোনো পশম না কাটা ‘মুস্তাহাব’।
- মুস্তাহাব কী? মুস্তাহাব হলো এমন আমল, যা পালন করলে অনেক সওয়াব বা পুণ্য পাওয়া যায়। তবে কোনো কারণে যদি কেউ এটি পালন করতে না পারে, তবে তার কোনো গুনাহ বা পাপ হবে না।
- কুরবানির ক্ষতি হবে কি? অনেকেই ভুলবশত মনে করেন যে, এই সময়ে নখ বা চুল কাটলে হয়তো কুরবানি কবুল হবে না। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। নখ বা চুল কাটলে কুরবানির কোনো ক্ষতি বা ত্রুটি হয় না।
(তথ্যসূত্র: ফতোয়ায়ে শামি, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-১৮১)
একটি জরুরি সতর্কতা: ৪০ দিনের নিয়ম
নখ ও চুল না কাটার এই মুস্তাহাব আমলটি পালন করার সময় একটি বিশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ইসলামে পরিচ্ছন্নতার ওপর অনেক জোর দেওয়া হয়েছে।
হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, শরীরের অপ্রয়োজনীয় পশম ও নখ যেন কোনোভাবেই ৪০ দিনের বেশি বড় না থাকে। যদি জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার আগেই কারও নখ বা নাভির নিচের পশম ৪০ দিন পার হয়ে যায় বা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে মুস্তাহাব আমল রক্ষা করতে গিয়ে ফরজ বা ওয়াজিবের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ পরিচ্ছন্নতার নিয়ম লঙ্ঘন করা যাবে না। অর্থাৎ, ৪০ দিন পার হওয়ার আগেই নখ ও পশম কেটে পরিষ্কার করে নিতে হবে। পরিচ্ছন্ন থাকা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা।
যারা কুরবানি দিতে পারছেন না তাদের জন্য কি কোনো সুযোগ আছে?
ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি কাউকে বঞ্চিত করে না। যারা আর্থিক অসচ্ছলতা বা অন্য কোনো কারণে কুরবানি দিতে পারছেন না, তাদের জন্যও এই দিনগুলোতে রয়েছে বিশেষ সওয়াব লাভের সুযোগ।
বিভিন্ন হাদিসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যারা কুরবানি দিতে অপারগ, তারাও যদি জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন নখ ও চুল না কেটে ঈদের দিন ঈদের সালাতের পর তা কাটেন, তবে আল্লাহ তাআলা তাদের আমলনামায় একটি পূর্ণ কুরবানির সওয়াব দান করতে পারেন। আল্লাহর দয়া ও রহমত অসীম, তিনি বান্দার নিয়ত ও আন্তরিকতা দেখেন।
আমাদের করণীয়
ইসলাম আমাদের জীবনের প্রতিটি সাধারণ কাজকে ইবাদতে বা সওয়াবের মাধ্যমে পরিণত করার সুযোগ দেয়। কুরবানির আগে নখ ও চুল না কাটা বাধ্যতামূলক বা ফরজ কোনো বিধান নয়। তবে এটি আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি সুন্দর আমল এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম।
তাই আমাদের যাদের সামর্থ্য ও সুযোগ রয়েছে, তাদের উচিত পূর্ণ ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে এই মুস্তাহাব আমলটি পালন করা। তবে কোনো কারণে কেউ যদি এটি পালন করতে না পারে, তাকে দোষারোপ করা বা গুনাহগার মনে করা একদমই ঠিক নয়। ইসলামে জোরজবরদস্তির কোনো স্থান নেই। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা ত্যাগ, তাকওয়া, আন্তরিকতা এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।




